Showing posts with label শ্রী রাম. Show all posts
Showing posts with label শ্রী রাম. Show all posts

Friday, 10 July 2020

রামচন্দ্রের শম্বুক হত্যা : প্রকৃত সত্যটা কী ?


রামচন্দ্রের শম্বুক হত্যা : প্রকৃত সত্যটা কী ?

রামচন্দ্র, তপস্যা করার অপরাধে শম্বুক নামে এক শুদ্রকে হত্যা করেছে, এমন কথা বলা আছে রামায়ণের উত্তরকাণ্ডের ২৪ নং উপাখ্যানে, ৭২ থেকে ৭৬ সর্গে।

এই উপাখ্যানটি রাজশেখর বসু তার বাল্মীকি রামায়ণে অনুবাদ করেছেন এভাবে-

"একদিন এক বৃদ্ধ গ্রামবাসী ব্রাহ্মণ তাঁর কিশোর বয়স্ক মৃত পুত্রকে নিয়ে রাজদ্বারের এসে সরোদনে বলতে লাগলেন, পূর্বজন্মের কোন পাপের ফলে আমি এই একমাত্র পুত্রকে মৃত দেখছি ? পুত্র, তুমি যৌবন লাভের পূর্বেই গত হয়েছ, তোমার জননী আর আমিও তোমার শোকে শীঘ্র প্রাণত্যাগ করব। আমি কখনো মিথ্যা বলিনি, হিংসা করি নি। অন্য কোন পাপও করি নি। কোন্ দুষ্কৃতের ফলে এই বালক পিতৃকার্য না করে যমলোকে গেল ? নিশ্চয় রামের কোনও মহৎ পাপ আছে তাই তার রাজ্যে এই বালকের অকালমৃত্যু হল। অন্য রাজ্যে এমন ঘটে না। মহারাজ, তুমি আমার বালককে জীবিত কর, নতুবা আমি পত্নীর সঙ্গে রাজদ্বারে মরব। ব্রহ্মহত্যার পাপভাগী হয়ে তুমি সুখে থাক ভ্রাতাদের সহিত দীর্ঘায়ু লাভ কর। রাজার দোষেই প্রজারা বিপদগ্রস্ত হয়, রাজা অধর্মচারী হলে প্রজা মরে। অথবা নগর ও গ্রামের লোক দুষ্কার্য করছে, রাজা তাদের শাসন করেন না, তারই এই ফল। রাজার দোষেই এই বালকের মৃত্যু হয়েছে।

ব্রা্হ্মণের করুণ বিলাপ শুনে রাম দুখার্ত হয়ে বশিষ্ঠাদি ঋষি ও ভ্রাতৃগণকে ডেকে আনালেন। মার্কণ্ডেয় কাশ্যপ গৌতম নারদ প্রভূতিও এলেন। রাম বালকের অকালমৃত্যুর কারণ জিজ্ঞাসা করলে নারদ বললেন, সত্যযুগে কেবল ব্রাহ্মণরাই তপস্যা করতেন, তখন অকালমৃত্যু ছিল না। ত্রেতাযুগে ক্ষত্রিয়রাও তপস্যায় প্রবৃত্ত হলেন, ব্রা্হ্মণ ও ক্ষত্রিয়ের মধ্যে বিশিষ্টতা রইল না, সেজন্য তখন চাতুর্বণ্য স্থাপিত হল। এই সময়ে অধর্মের একপাদ পৃথিবীতে এল। ত্রেতাযুগে ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয়ের শুশ্রুষা করাই বৈশ্য শুদ্রের বিশেষত শুদ্রের কর্ম হল। তারপর অধর্মের দ্বিতীয় পাদ ও দ্বাপর যুগ এল, বৈশ্যরাও তপস্যা করতে লাগল। কিন্তু শুদ্রের তখন সে অধিকার হল না। হীনবর্ণ শুদ্রেরা ভবিষ্যতে কলিযুগে ঘোর তপস্যা করবে, কিন্তু দ্বাপরে তাদের পক্ষে তপস্যা পরম অধর্ম। মহারাজ, তোমার রাজ্যে কোন দুর্বুদ্ধি শুদ্র তপস্যা করছে, সেই পাপেই এই বালক মরেছে। তুমি সর্বত্র অনুসন্ধান কর।"

… এরপর রাম সেই শুদ্রকে খুঁজতে খুঁজতে রাজ্যের দক্ষিন দিকে গিয়ে দেখলেন,

"শৈবাল পর্বতের উত্তরে এক বৃহৎ সরোবরের তীরে অধোমুখে লম্ববান হয়ে একজনা তপস্বী কঠোর তপস্যা করছেন। রাম তাকে বললেন, সুব্রত, তুমি ধন্য। আমি দাশরথি রাম, কৌতূহল বশে প্রশ্ন করছি- কেন এই দুষ্কর তপস্যা করছ ? তোমার অভীষ্ট কি স্বর্গলাভ না আর কিছু ? তুমি কোন্ জাতি, ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, না শুদ্র, সত্য বল।

তপস্বী অধোমস্তকে থেকেই উত্তর দিলেন, আমি সশরীরে দেবত্ব লাভের নিমিত্তে তপস্যা করছি। রাম, আমি দেবলোক জয় করতে চাই। মিথ্যা বলবো না, আমি জাতিতে শুদ্র, নাম শম্বুক। রাম তখনই খড়গ কোষমুক্ত করে শুদ্র তপস্বীর শিরশ্ছেদ করলেন। আকাশ খেকে পুষ্পবৃষ্টি হল, দেবগণ বললেন, রাম, তুমি আমাদের প্রিয়কার্য করেছ, তোমার জন্যই এই শুদ্র স্বর্গাধিকারী হল না'। তুমি অভীষ্ট বর প্রার্থনা কর। রাম ইন্দ্রকে বললেন, সেই ব্রাহ্মণপুত্রকে জীবনদান করুন। দেবতারা বললেন, কাকুৎস্থ, নিশ্চিত হও, আজ সেই বালক জীবনলাভ করে তার আত্মীয়দের সাথে মিলিত হয়েছে। এই শুদ্রের নিধনের সঙ্গে সঙ্গেই সে জীবনলাভ করেছে।"

এই ছিলো রাজশেখর বসু কর্তৃক অনুবাদিত বাল্মীকি রামায়ণের রামচন্দ্র কর্তৃক তথাকথিত শুদ্র শম্বুক হত্যার ঘটনার বর্ণনা। এবার ঘটনার বিশ্লেষণে ঢোকা যাক-

ঘটনার শুরুতেই আমরা দেখতে পাই, এক বৃদ্ধ ব্রাহ্মণ, তার ছেলের অকাল মৃত্যুর জন্য রামকে দায়ী করছে; কারণ, রাম তার রাজ্যের রাজা।

-আচ্ছা, পৃথিবীর কোনো কালে কি মানুষের আয়ূ নির্দিষ্ট ছিলো যে, জন্ম হলেই যেকোনো মানুষ একটি নির্দিষ্ট বয়স পর্যন্ত বেঁচে থাকবে ?

না, এমনটা কখনোই ছিলো না এবং এমনটা কখনোই কোনো গ্রন্থে দেখা যায় নি। সনাতন ধর্মীয় কোনো গ্রন্থে এরকম উদাহরণ আর দ্বিতীয়টি নেই। সুতরাং ঐ বৃদ্ধ ব্রাহ্মণের এই বিশ্বাস সত্য নয় যে রামের কারণেই তার ছেলের অকাল মৃত্যু হয়েছে, যেহেতু পৃধিবীতে কোনো মানুষের আয়ু নির্দিষ্ট নয় এবং কে কতদিন বেঁচে থাকবে, নির্দিষ্ট করে কেউ কখনো বলতে পারে না।

এরপর আমরা দেখতে পাই, ব্রাহ্মণের করুণ বিলাপ শুনে রাম বশিষ্ঠাদি ঋষি ও ভ্রাতৃগণকে ডেকে আনালেন। মার্কণ্ডেয় কাশ্যপ গৌতম নারদ প্রভূতিও এলেন।

-বশিষ্ঠাদি ঋষি রামের সভাসদ হতে পারেন, তাদেরকে ডাকলেই রাম তাদেরকে পেতে পারেন, কিন্তু নারদ কি রামের সভাসদ যে বশিষ্ঠাদি ঋষি ও রামের ভাইদের সাথে সাথে তিনিও রামের রাজসভায় হাজির থাকবেন ? নারদ, ব্রহ্মার মানসপুত্র, সৃষ্টির শুরুতে ব্রহ্মা নিজেই নারদকে বলেছিলেন প্রজা সৃস্টি করতে, কিন্তু প্রজা সৃষ্টি করলে তাকে এক জায়গায় স্থিতু হতে হবে বলে নারদ প্রজা সৃষ্টিতে রাজী হন নি, তারপর থেকেই নারদ সাংবাদিকের দায়িত্ব পালন করতে সব সময় স্বর্গ থেকে মর্ত্যে ঘুরে বেড়ান এবং নারদ সব সময় নিজের ইচ্ছাতেই সব জায়গায় যান। সেই নারদ, রামের রাজসভায় সভাসদ হয়ে বসে থাকবেন, বিষয়টি কেমন বেমানান বা অযৌক্তিক মনে হচ্ছে না ?

এরপর রাম বালকের অকালমৃত্যুর কারণ জিজ্ঞাসা করলে নারদ বললেন, সত্যযুগে কেবল ব্রাহ্মণরাই তপস্যা করতেন, তখন অকালমৃত্যু ছিল না। ত্রেতাযুগে ক্ষত্রিয়রাও তপস্যার প্রবৃত্ত হলেন, ব্রা্হ্মণ ও ক্ষত্রিয়ের মধ্যে বিশিষ্টতা রইল না, সেজন্য তখন চাতুর্বণ্য স্থাপিত হল।

-সত্যযুগে কেবল ব্রাহ্মণরাই তপস্যা করতো এবং অকাল মৃত্যু ছিলো না, এটা অন্য কোনো সনাতনী ধর্মগ্রন্থে পাওয়া যায় না, সুতরাং এই প্রসঙ্গটিও প্রশ্নের উর্ধ্বে নয়; আর ত্রেতাযুগে যদি চাতুর্বণ্য স্থাপিত হয়, তাহলে সত্যযুগে ব্রাহ্মণের কথা আসছে কিভাবে ? যতক্ষণ চতুর্বর্ণের ভাগ না হয়েছে, ততক্ষণ তো ব্রা্হ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শুদ্র বলে কিছু থাকারই কথা নয়।

উপরের এই আলোচনা থেকে বোঝা যায় যে, এই উপাখ্যানটি আসলে একটি মিথ্যা উপাখ্যান, যার উদ্দেশ্য হলো রামের মাধ্যমে শুদ্রদেরকে শুধু হেয় নয়, ধ্বংস করা। কোনো শুদ্র বিদ্বেষী ব্রাহ্মণ যে এই মিথ্যা উপাখ্যানটি রামায়নে জুড়ে দিয়েছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। আমার এই দাবীর প্রমাণ দিচ্ছি নিচে-

আমাদের সমাজে প্রচলিত রামের জীবন কাহিনীতে, যুদ্ধ থেকে ফেরার পর বেশ কিছু অসঙ্গতি আছে, যেগুলো নিয়ে মানুষ নানারকম প্রশ্ন তুলতে পারে। যেমন- সীতার চরিত্র নিষ্কলুষ কিনা, তার জন্য একবার সীতার অগ্নিপরীক্ষা নিয়ে রাম তাকে গ্রহণ করে। এরপর সীতা, গর্ভবতী হওয়ার পর প্রজাদের মধ্যে আবার সীতার চরিত্রের নিষ্কলুষতা নিয়ে গুঞ্জন শুরু হয়, ফলে রাম, প্রজাদের মন রক্ষার্থে সীতাকে বনবাস দেয়। রামের চরিত্রের সঙ্গে এই বিষয়গুলো ঠিক যায় না। সীতার যখন অগ্নিপরীক্ষা হয়েছে, তখন সেটা প্রকাশ্যে দিবালোকে হয়েছে, অনেক লোক সেখানে উপস্থিত ছিলো, তারপর আবার প্রজাদের মনে সীতা, যিনি তাদের মহারাণী, তার চরিত্র নিয়ে গুঞ্জন ঠিক শোভা পায় না। কারণ, সীতা কোনো সাধারণ নারী ছিলেন না, ছিলেন রামের স্ত্রী, অযোধ্যার মহারাণী; চারিত্রিক দোষ ত্রুটিতে একজন সাধারণ নারীর প্রতি আঙ্গুল তোলা খুব সহজ, কিন্তু একজন সম্ভ্রান্ত বা পাওয়ারফুল নারীর প্রতি কোনো দোষ ত্রুটিতে আঙ্গুল তোলা অত যে সহজ নয়, সেটা আমরা আমাদের বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকেই বুঝতে পারি। তাই সীতার চরিত্র নিয়ে সাধারণ প্রজারা প্রশ্ন তুলেছে বা প্রশ্ন তুলতে পারে, এটা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যা্য় না বা বিশ্বাসযোগ্য নয়।

যুদ্ধ থেকে ফেরার পর রামের চরিত্রের এই সব নানা অসঙ্গতি ও আপত্তিকর ব্যাপার সম্পর্কে রাজশেখর বসু তার অনুবাদিত রামায়ণের ভূমিকায় বলেছেন,

"এই আপত্তির একটা উত্তর দেওয়া যেতে পারে। বর্তমান বাল্মীকি রামায়ণের কতক অংশ পরে জুড়ে দেওয়া হয়েছে, যেমন উত্তরকাণ্ড। যুদ্ধকাণ্ডের শেষে রামায়ণ মাহাত্ম্য আছে, তাতেই প্রমাণ হয় যে মূল গ্রন্থ সেখানেই সমাপ্ত।

মহাভারতের অন্তর্গত রামোপখ্যানে রাবনবধের পর রামের সীতা প্রত্যাখ্যান এ সীতার শপথের বৃত্তান্ত আছে, কিন্তু নির্বাসন ও পাতালপ্রবেশ নেই। অতএব বাল্মীকি দুবার নিষ্ঠুরতা করেন নি, কঠোর রাজধর্মের আদর্শ দেখাবার জন্য শুধু একবার সীতার অগ্নিপরীক্ষার বর্ণনা দিয়েছেন। তাঁর মূল কাব্য মিলনান্ত, অযোধ্যায় ফিরে যাবার পর রাম সীতার আবার বিচ্ছেদ হয়েছিল এমন কথা বাল্মীকি লিখেন নি। সীতার বনবাস আর পাতাল প্রবেশের জন্য তিনি দায়ী নন।"

একজন ইংরেজ গবেষক A Berriedale Keith এর মতে, যিনি মূল রামায়ণের সাথে উত্তরকাণ্ড জুড়ে দিয়েছেন তার সময় সম্ভবত খ্রি.পূ. ২০০ থেকে ৪০০ অব্দ। এই প্রাচীন কবি সম্পর্কে রাজশেখর বসুর মন্তব্য-

"এ কথা নিশ্চিত যে মূল গ্রন্থে যিনি সীতার নির্বাসন প্রভূতি জুড়ে দিয়েছেন তিনিও অতি প্রাচীন এবং তাঁর কবিত্ব সামান্য নয়।… তিনি নিজের স্বাতন্ত্র রাখেন নি, তাঁর রচনা বাল্মীকির রচনার সঙ্গে এমনভাবে জড়িয়ে গেছে যে সমস্তই এখন বাল্মীকির নামে চলে।"

যা হোক, সীতার চরিত্র নিয়ে প্রজাদের অভিযোগ, অন্তঃসত্ত্বা সীতার বনবাস, অভিমানী সীতার পাতালপ্রবেশ এবং রামচন্দ্র কর্তৃক শম্বুক হত্যার মতো ঘটনাগুলো রয়েছে রামায়ণের উত্তরকাণ্ডে, আর রামায়ণের উত্তরকাণ্ড যে বাল্মীকি দ্বারা রচিত নয়, পরবর্তীতে কোনো কবির দ্বারা এটি রামায়ণের সাথে জুড়ে দেওয়া, তথ্য প্রমাণসহ সেই বিষয়টি আমার পাঠকবন্ধুদেরকে বোঝাতে পেরেছি বলে আমি মনে করছি; ফলে রামের হাতে শুদ্র শম্বুক হত্যার মতো কোনো ঘটনা ই বাস্তবে ঘটে নি, যিনি এই উপাখ্যানটি লিখে রামায়ণের সাথে জুড়ে দিতে সক্ষম হয়েছিলেন, তিনি ছিলেন কোনো কারণে প্রবল শুদ্র বিদ্বেষী, রামের হাতে তাই এক শুদ্রকে নির্মমভাবে হত্যা করিয়ে তিনি জাস্ট তার প্রতিশোধ নিয়েছিলেন মাত্র।

শম্বুক হত্যার কাহিনীতে আরেকটি অসঙ্গতি আছে। যেমন-রাম যখন দেখে যে- শৈবাল পর্বতের উত্তরে এক বৃহৎ সরোবরের তীরে অধোমুখে লম্ববান হয়ে একজন তপস্বী কঠোর তপস্যা করছে, তখন রাম তাকে বলে, আমি দাশরথি রাম, কৌতূহল বশে প্রশ্ন করছি- কেন এই দুষ্কর তপস্যা করছ ? তোমার অভীষ্ট কি স্বর্গলাভ না আর কিছু ? তুমি কোন্ জাতি, ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, না শুদ্র, সত্য বল।

তপস্বী তখন অধোমস্তকে থেকেই উত্তর দেয়, আমি সশরীরে দেবত্ব লাভের নিমিত্তে তপস্যা করছি। রাম, আমি দেবলোক জয় করতে চাই। মিথ্যা বলবো না, আমি জাতিতে শুদ্র, নাম শম্বুক। রাম তখনই খড়গ কোষমুক্ত করে শুদ্র তপস্বীর শিরশ্ছেদ করে। আকাশ খেকে পুষ্পবৃষ্টি হয়, দেবগণ বলে, রাম, তুমি আমাদের প্রিয়কার্য করেছ, তোমার জন্যই এই শুদ্র স্বর্গাধিকারী হল না'। তুমি অভীষ্ট বর প্রার্থনা কর।

- রামচন্দ্র হলেন, রাবনবধকারী লঙ্কাবিজয়ী বীর অযোধ্যার রাজা, আর তার রাজ্যের একজন সাধারণ তপস্বী তাকে এইভাবে নামধরে সম্বোধণ করে বলবে, "রাম, আমি দেবলোক জয় করতে চাই।" এটা কি সম্ভব ?

এরপর রাম যখন তাকে হত্যা করে তখন আকাশ খেকে পুষ্পবৃষ্টি হয়, দেবগণ বলে, রাম, তুমি আমাদের প্রিয়কার্য করেছ, তোমার জন্যই এই শুদ্র স্বর্গাধিকারী হল না'।

-আমরা জানি, স্বর্গের রাজা হলেন দেবরাজ ইন্দ্র, আর ইন্দ্র যেকোনো মূল্যে যে তার রাজ্য এবং রাজত্বকে রক্ষা করতে সর্বদায় তৎপর, যেটা আমরা অহল্যা ও গৌতমের কাহিনী, যে কাহিনীতে- গৌতম মুনি তপস্যার দ্বারা এমন শক্তি অর্জন করে ফেলেছিলো যে, যে শক্তি দিয়ে সে স্বর্গলোক জয় করতে পারতো, সেই শক্তিকে নষ্ট করার জন্য ইন্দ্র, গৌতমের স্ত্রী অহল্যার সাথে গৌতমের ছদ্মবেশে যৌনক্রিয়া করে, যেটা জানতে পেরে গৌতম, অহল্যা এবং ইন্দ্রকে অভিশাপ দেয়, যার ফলে গৌতমের তপস্যার সমস্ত শক্তি নষ্ট হয়- স্বর্গলোককে রক্ষার জন্য যে ইন্দ্র এমন দুষ্কর্মও করতে পারে, সেই ইন্দ্র, শম্বুকের তপস্যার শক্তিকে নষ্ট করার জন্য রামের উপর নির্ভর করে বসে থাকবে, এটা বিশ্বাসযোগ্য নয়। শম্বুক নামের কেউ যদি সত্যিই স্বর্গ দখল করার চেষ্টা করতো, ইন্দ্র, নিজেই তার প্রতিবিধান করতো বলে আমি মনে করি।

আবার দেখুন শম্বুককে হত্যা করার পর দেবগণ রামকে বলে,

"তুমি অভীষ্ট বর প্রার্থনা কর।"

রাম কি কোনো সাধারণ মানুষ যে সে দেবতাদের নিকট বর প্রার্থনা করবে ? রাম ই তো স্বয়ং বিষ্ণু বা নারায়ণ, যিনি বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সকল কারণের কারণ; আর দেবতারা হলেন সেই বিষ্ণুর থেকেই উৎপন্ন এক একটি সত্ত্বা বা দেবশক্তি, যারা বিষ্ণুর বলেই বলীয়ান, তাহলে এই দেবতারা কিভাবে রামকে বর দিতে পারে ? বিষ্ণুর কোনো অবতার কি, কখনো, কোনো ঘটনাতে কোনো দেব-দেবীর কাছে সাহায্য চেয়েছে ? এমন ঘটনা কি কোনো পুরাণে আছে ?

নেই।

রামায়ণের উত্তরকাণ্ডের এই সকল ঘটনা বিশ্লেষণ করে আমি নিশঙ্কোচে বলতে পারি যে- উত্তরকাণ্ডে বর্ণিত সমস্ত কাহিনী মিথ্যা ও বানোয়াট, বাল্মীকি মুনি এই ঘটনাগুলো লিখেন নি, ফলে রামচন্দ্র, শম্বুক হত্যার দায়ে দায়ী নয়।
আশা করছি, বিষয়টি সবার কাছে ক্লিয়ার হয়েছে।

জয় হিন্দ।
জয় শ্রীরাম, জয় শ্রীকৃষ্ণ।

-----------------------------------------
বি.দ্র #  বাংলাদেশে, ঘরে বসে কুরিয়ারের মাধ্যমে যারা রাজশেখর বসুর রামায়ণ, মহাভারত; গদ্য ভাগবত, বেদ, উপনিষদসহ সনাতন ধর্মীয় বিভিন্ন গ্রন্থ পেতে চান, তারা আমার সাথে যোগাযোগ করুন।

Sunday, 31 May 2020

প্রসঙ্গ : রামকৃষ্ণদেব এবং যত মত তত পথ


প্রসঙ্গ : রামকৃষ্ণদেব এবং  যত মত তত পথ

ফটো পোস্টে দেখুন সাধন দাস নামের এই ব্যক্তি আমাকে প্রশ্ন করেছে, As a hindu do u believe on Ramkrishna Paramhansa, মানে হলো- একজন হিন্দু হিসেবে আপনি কি রামকৃষ্ণ পরমহংসকে বিশ্বাস করেন ?
হুমায়ূন আজাদ বিশ্বাস অবিশ্বাস প্রসঙ্গে বলেছেন, সব বিশ্বাসই অপবিশ্বাস, এর সরল মানে হচ্ছে যা মিথ্যা তাকেই বিশ্বাস করতে হয়, যা সত্য তাকে বিশ্বাস করতে হয় না; এই সূত্রে যেসব তথাকথিত ধর্ম, (আমার মতে ব্যক্তিগত মতবাদ) বিশ্বাসের উপর প্রতিষ্ঠিত সেগুলো টোটালি বোগাস; কিন্তু আমি সব সময় বলি এবং এখনও বলছি- হিন্দুধর্ম কোনো বিশ্বাসের ব্যাপার নয়, হিন্দুধর্ম হলো বাস্তব; পৃথিবীর যা কিছু বাস্তব তাই সনাতন ধর্ম, এমনকি সনাতন ধর্মের ঈশ্বর শ্রীকৃষ্ণও পৃথিবীতে এসে তাঁর কর্ম ও বাণীর মাধ্যমে প্রমাণ করে দিয়ে গেছেন যে তিনি ঈশ্বর, তাই হিন্দুধর্মকে বোঝার জন্য কোনো কিছু বিশ্বাস করার দরকার নেই।

এ প্রসঙ্গে সাধন বাবুকে বলছি, রামকৃষ্ণদেব পৃথিবীতে জন্ম নিয়েছিলেন, তিনি কালী ভক্ত ছিলেন, তাঁর শিষ্য ছিলেন স্বামী বিবেকানন্দ এবং রামকৃষ্ণদেবের কর্মস্থল ছিলো কোলকাতা, তার নামে প্রতিষ্ঠিত আশ্রমের নাম রামকৃষ্ণ মিশন, সুতরাং তার অস্তিত্বে অবিশ্বাস করার তো কোনো কারণ নেই। কিন্তু আপনি যদি বলেন রামকৃষ্ণদেবের আদর্শে বা থিয়োরিতে বিশ্বাস করেন কি না, আমি বলবো- না, রামকৃষ্ণদেবের আদর্শে আমি বিশ্বাসী নয়; কারণ, রামকৃষ্ণদেবের আদর্শ হিন্দুধর্মের কোনো আদর্শ নয়, ওটা তার ব্যক্তিগত মতবাদ এবং তার মতবাদের দ্বারা হিন্দুধর্ম ও সমাজের কোনো উপকার হয় নি, বরং ক্ষতিই হয়েছে এবং এখনও হচ্ছে।

রামকৃষ্ণদেবের প্রসঙ্গে আপনি "যত মত তত পথ" এর কথা উল্লেখ করেছেন। এই 'যত মত তত পথ' থিয়োরি দিয়ে রামকৃষ্ণদেব পৃথিবীর তথাকথিত সকল ধর্মমতকে স্বীকার করে নিয়েছেন, যেটার উপর ভিত্তি করে রামকৃষ্ণ মিশন, সর্বধর্ম সমন্বয়ের সভা ও সর্বধর্ম সমন্বয়ের চেষ্টা ক'রে হিন্দু সমাজ ও হিন্দুদের পাছায় আচাঁছা বাঁশ দিয়ে যাচ্ছে, যেটা বোঝার মতো ক্ষমতা আপনাদের মতো ভাববাদীদের নেই।

রামকৃষ্ণদেব "যত মত তত পথ" ব'লে সকল ধর্মকে স্বীকার করে নিয়ে তিনি আসলে এটা প্রমাণ করে দিয়েছেন যে, তিনি আসলে- ধর্ম কী সেটাই জানতেন না বা ধর্মের সংজ্ঞাই বুঝতেন না। যদি বুঝতেন, তাহলে তিনি এটা জানতেন যে, পৃথিবীতে ধর্ম একটাই সেটা সনাতন ধর্ম, বাকিগুলো সব ব্যক্তিগত মতবাদ। ব্যক্তিগত মতবাদগুলোকে তিনি ধর্ম হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে প্রকৃত ধর্ম সনাতনকে শুধু অপমানই করেন নি, সনাতন ধর্মের প্রভূত ক্ষতিও করেছেন।

রামকৃষ্ণদেব নাকি বিভিন্ন ধর্মমতে সাধনা ক'রে সিদ্ধি লাভ করেছিলেন, এসব কথা বার্তা মূর্খদেরকে বিশ্বাস করানো সম্ভব, প্রকৃত জ্ঞানীদেরকে নয়। সনাতন ধর্ম ছাড়া অন্য মতবাদগুলো যেখানে ধর্মই নয়, সেখানে তিনি সেসব মতবাদ অনুসারে সিদ্ধিলাভ করেছেন কিভাবে ? ভুল পথে কি সঠিক গন্তব্যে পৌঁছানো সম্ভব ?

কোন কোন ধর্ম অনুযায়ী রামকৃষ্ণদেব সাধনা করেছিলেন, সেসব ডিটেলস জানা না গেলেও তিনি যে ইসলামের চর্চা করেছিলেন, সেটা জানা যায়; এই ইসলাম চর্চা করতে গিয়ে তিনি নাকি নামায পড়তেন এবং মুসলিম হিসেবে এক পর্যায়ে তার নাকি গরুর মাংস খাওয়ার ইচ্ছাও জেগেছিলো, এই শখ পূরণে নাকি রামকৃষ্ণদেব, কুকুর রূপ ধারণ করে গঙ্গা দিয়ে ভেসে যাওয়া একটা মরা গরুর মাংসও খেয়েছিলেন, এসব কাহিনী তার ভক্ত শিষ্যরা তাদের বিভিন্ন বইতে উল্লেখ করেছেন। মুসলমান হলেই গরুর মাংস খেতে হবে, এটা এই ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলমানদের একটা জারজ স্বভাব, ইসলামের জন্মভূমি আরবের লোকজন এখনও গরুর মাংস খায় না, ইসলামের প্রবর্তক মুহম্মদ কখনো গরুর মাংস খায় নি, এমনকি গরু কুরবানী দেওয়ার বিধানও কোরানে নেই, কোরানে উট কুরবানী করার বিধান আছে; সুতরাং ভেতরে মুসলিম ভাবধারা লালন করলেই যে গরুর মাংস খেতে হবে, আগেই বলেছি এটা একটা জারজ বিশ্বাস, এই বিশ্বাসকে মনে লালন করতেন রামকৃষ্ণদেব, সুতরাং তিনি কত বড় জ্ঞানী সেটা এবার নিজেই বিচার করেন।

যা হোক, এখন প্রশ্ন হচ্ছে, রামকৃষ্ণদেব যে নামায পড়তেন, তিনি কি জানতেন, নামাযে দাঁড়িয়ে তিনি যে সূরাগুলো আবৃত্তি করতেন, সেগুলোতে মানুষকে অভিশাপ দেওয়ার, আল্লা ও মুহম্মদে অবিশ্বাসী অর্থাৎ হিন্দুদেরকে হত্যা করার কথা বলা আছে, হিন্দুদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহন করতে মুসলমানদেরকে নিষেধ করা আছে, হিন্দুদের সম্পত্তি লুঠ করে খেতে মুসলমানদেরকে নির্দেশ দেওয়া আছে, গনিমতে মাল হিসেবে হিন্দুমেয়েদেরকে ধর্ষণ করার কথা বলা আছে; রামকৃষ্ণদেব কি ইসলাম সম্পর্কে এই বিষয়গুলো জানতেন ? আমি নিশ্চিত, তিনি জানতেন না; জানলে নামায পড়তে পারতেন না বা ইসলামের চর্চা করতে পারতেন না। কারণ, কোনো সুস্থ ও বিবেকবান মানুষ যেমন মুসলমান হতে পারে না, তেমনি কোনো জ্ঞানী মানুষ ইসলামকে সাপোর্ট করতে পারে না। রামকৃষ্ণদেবের ইসলাম চর্চা এটাই প্রমাণ করে যে ইসলাম সম্পর্কে তাঁর কোনো ধারণাই ছিলো না, তাহলে তিনি কিভাবে জ্ঞানী ? আর জ্ঞান ছাড়া কেউ কিভাবে মহাপুরুষ হতে পারে ?

এবার আসুন দেখা যাক- যত মত তত পথ এবং এই থিয়োরি থেকে উদ্ভব রামকৃষ্ণ মিশনের "সর্বধর্ম সমন্বয়ের চেষ্টা" কিভাবে হিন্দুধর্ম ও হিন্দু সমাজের ক্ষতি করছে ?

ধরে নিলাম আপনি রামকৃষ্ণ মিশনের দীক্ষিত একজন হিন্দু, তো আপনি আদর্শিকভাবে রামকৃষ্ণদেবের থিয়োরিতে বিশ্বাস করেন এবং নিজে বা রামকৃষ্ণ মিশনের আশ্রমে নিয়ে গিয়ে সন্ন্যাসীদের মাধ্যমে ছেলে মেয়েদেরকে শিখাচ্ছেন যে সকল ধর্মই সত্য; তো আপনার ছেলে মেয়ে এই শিক্ষা নিয়ে বড় হলো যে সকল ধর্মই সত্য এবং সকল পথেই ঈশ্বরকে লাভ করা যায়। এরপর কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় বা পড়াশোনা শেষে চাকরি করার সময় তার খ্রিষ্টান বা মুসলিম কোনো ক্লাসমেট বা কলিগের প্রেমে পড়ে গেলো এবং সে যেহেতু এটা বিশ্বাস করে যে, সকল ধর্মই সত্য, সুতরাং সে অনায়াসে তার প্রেমিক বা প্রেমিকার ধর্মের দীক্ষিত হয়ে হিন্দু সমাজ ত্যাগ করলো; আপনি যেহেতু তাকে শিখিয়েছেন যে সকল ধর্মই সত্য, সুতরাং তার এই ধর্মত্যাগের ডিসিসানে আপনি কিছু করতে বা বলতে পারবেন না। এভাবে হিন্দু সমাজের একজন জনসংখ্যা কমলো এবং মুসলিম বা খ্রিষ্টান বা বৌদ্ধ সমাজের একজন জনসংখ্যা বাড়লো এবং তার সন্তান সন্তুতির মাধ্যমে সেই সংখ্যা আরো বাড়বে এবং হিন্দু সমাজের জনসংখ্যা আরো কমবে এবং এইভাবে জনসংখ্যা হারিয়ে সমগ্র হিন্দু সমাজ আস্তে আস্তে কোনঠাসা হয়ে পড়বে বা বিলুপ্ত হয়ে যাবে।

একটি জাতি বা সমাজ টিকে থাকে তার জনসংখ্যার উপর, জনসখ্যার জোরে; রামকৃষ্ণ মিশনের আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে এভাবে সব হিন্দু যদি এক সময় অন্য ধর্মে কনভার্ট হয়ে যায়, বাঙ্গালি হিন্দু সমাজের অস্তিত্ব থাকবে কোথায় ? আর কে তখন রামকৃষ্ণ আশ্রমে গিয়ে নপুংসক সন্ন্যাসীদের মুখে সর্বধর্ম সমন্বয়ের বক্তৃতা শুনবে ? কারণ, কোনো অহিন্দু তো ঐ সব হিজড়া সন্ন্যাসীদের মুখে সর্বধর্ম সমন্বয়ের বক্তৃতা শুনে এ পর্যন্ত হিন্দুধর্মে দীক্ষা নেয় নি এবং ভবিষ্যতেও নেবে না, আর সম্পূর্ণ সনাতন ধর্ম অবিরোধী সৃষ্টি প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করে সাধু সন্ন্যাসী মহারাজরাও তো বিয়ে শাদী করে সন্তানের জন্ম দেয় না, তাহলে সনাতন সমাজ টিকে থাকবে কিভাবে ?

এখন আপনারাই বুঝে নিন, রামকৃষ্ণ মিশন কিভাবে হিন্দুধর্ম ও সমাজের ক্ষতি করছে এবং কেনো আমি বলেছি যে রামকৃষ্ণ মিশন এই মূহুর্তে হিন্দুদের জন্য সবচেয়ে ক্ষতিকর একটি সংগঠন ?

হিন্দুদের জন্য একমাত্র আদর্শ পরমেশ্বর শ্রীকৃষ্ণ, শুধু তাকে ফলো করুন, অবশ্যই তথাকথিত রাধা এবং শ্রীকৃষ্ণের তথাকথিত বহু বিবাহকে বাদ দিয়ে; কারণ, এগুলো সম্পূর্ণ মিথ্যা। শ্রীকৃষ্ণের জীবনে রাধা বলে যেমন কেউ নেই, তেমনি তার জীবনে রুক্মিণী ছাড়া অন্য কোনো স্ত্রী নেই। মোদীর মতো রাষ্ট্রনায়ক, যাদের ধ্যান জ্ঞান দেশ ও জাতি, তারা ছাড়া, কোনো সাধারণ মানুষ যদি বিয়ে না করে এবং সন্তানের জন্ম না দেয়, সমাজ ও ধর্মের ব্যাপারে তার কোনো ভূমিকা নেই; এই সূত্রে হিন্দু সমাজের উপকারে কোনো ভূমিকা নেই চৈতন্য, রামকৃষ্ণসহ অসংখ্য নিঃসন্তান সাধু সন্ন্যাসী মহারাজের, এদের চেয়ে শতগুনে শ্রেষ্ঠ একজন নিরক্ষর অশিক্ষিত সাধারণ গৃহস্থ হিন্দু, যে বিবাহ করেছে এবং কমপক্ষে একটি সন্তানের জন্ম দিয়েছে; কারণ, সে হিন্দু সমাজের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য একটি গাছ লাগিয়েছে, এই গাছ একদিন শুধু নিজেই হিন্দু সমাজকে যে ছায়া দেবে, তাই নয়, সেই গাছের ফল বা বীজ থেকে অনাগত ভবিষ্যতে হয়তো আরো এমন বৃক্ষের জন্ম হবে, যার ছায়ায় সমগ্র হিন্দু সমাজ আশ্রয় পাবে, এক্ষেত্রে চৈতন্য বা রামকৃষ্ণদের মতো নিঃসন্তান দিব্যজ্ঞানীদের ভূমিকা কী ?

আমার বাবা একজন অশিক্ষিত হিন্দু ছিলেন, কিন্তু তিনি ৭টি সন্তানের জন্ম দিয়েছেন এবং তাদেরকে বড় করার চেষ্টা করেছেন, এজন্য আমি খুব গর্বের সাথে বলতে পারি যে, আমার বাবা- চৈতন্য এবং রামকৃষ্ণের চেয়ে শ্রেষ্ঠ ছিলেন; কারণ, তার সাত সন্তানের একজন, আমার মধ্যে পরমেশ্বর শ্রীকৃষ্ণ সনাতন ধর্মের প্রকৃত সত্যের এমন জ্ঞান এবং কর্ম ক্ষমতা দিয়েছেন যে, যে জ্ঞান এবং কর্ম হিন্দু সমাজকে সনাতন ধর্মের প্রকৃত সত্যের পথে আমূল পাল্টে দিয়ে যাবে; যে কাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়ে গিয়েছে। এটা সম্ভব হচ্ছে শুধু আমার বাবার বিয়ে করা এবং আমাকে জন্ম দেওয়ার কারণে, তাহলে এবার নিজেই বিবেচনা করুন, কে শ্রেষ্ঠ, আমার বাবার মতো সাধারণ হিন্দুরা, নাকি বিয়ে শাদী না করা বা সন্তানের জন্ম দিতে অক্ষম নপুংসক সাধু, সন্ন্যাসী মহারাজরা ?

আরেক দিক দিয়েও সাধারণ গৃহস্থ হিন্দুরা, আশ্রমে থেকে শুয়ে বসে থাকা সাধু-সন্ন্যাসী-মহারাজদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ; কেননা, একজন সাধারণ গার্হস্থ্য হিন্দু নিজে পরিশ্রম করে নিজের পেটের ভাত যোগাড় করে, তার স্ত্রী পুত্র কন্যা পিতা মাতার ভরণ পোষণ করে, অভাবী দুঃস্থদের দান করে, অভূক্ত অনাহারীদের সেবাও দেয়। অন্যদিকে সাধু সন্ন্যাসীরা আয় রোজগার মূলক কোনো কাজ করে না, তারা কোনো উৎপাদনমূলক কাজ করে না, সাধারণ গৃহস্থ হিন্দুরা পুন্য অর্জনের উদ্দেশ্যে যে দান ভিক্ষা দেয়, তাই খেয়ে এরা বেঁচে থাকে; এক কথায় সাধু সন্ন্যাসীরা হলো পরগাছা, যেহেতু তারা নিজেরা কোনো উৎপাদনশীল কাজের সাথে জড়িত নয়; এখন আপনিই বিচার করুন, কে শ্রেষ্ঠ, একজন সাধারণ গার্হস্থ্য হিন্দু, না অকর্মা সাধু সন্ন্যাসীরা ?

এখানে আরেকটি বিষয় বলে রাখি- বাংলায় যেহেতু নপুংসকদের আস্তানা হিন্দুধর্মীয় সংগঠন আশ্রমের অভাব নেই, সেহেতু আপনি সমাজের যে স্তরের লোকই হোন না কেনো, আপনার যোগ্যতা যা ই হোক না কেনো, একটি আশ্রমে গিয়ে আপনার পক্ষে সাধু-সন্ন্যাসী-মহারাজ হওয়া কোনো ব্যাপারই নয়। পক্ষান্তরে আপনি যদি বিয়ে করে সংসার করতে চান, দেখবেন আপনাকে কোন কোন কোয়ালিটি ফেস করতে হয়, বিয়ে করার জন্য আপনাকে কোন কোন যোগ্যতা প্রদর্শন করতে হয় ? ভালো যোগ্যতা না থাকলে আপনি কোনো সুন্দরী মেয়েকে বিয়ে করতেই পারবেন না, আর কোনো রকম আয় রোজগার করার ক্ষমতা না থাকলে তো একটি প্রতিবন্ধী মেয়েকেও বিয়ে করার কথা স্বপ্নে ভাবতে পারবেন না। তার মানে বিয়ে করে সংসারী হওয়ার জন্য গুন ও যোগ্যতা লাগে, কিন্তু সাধু-সন্ন্যাসী হওয়ার জন্য কোনো যোগ্যতা লাগে না, তাহলে একজন সাধু সন্ন্যাসী কোন বিচারে একজন গৃহী মানুষের চেয়ে শ্রেষ্ঠ ?

আর ধর্মজ্ঞানের কথা বলছেন ? এস এস সি বা মাধ্যমিক পাশ করতে একজন স্টুডেন্টকে যে পরিমাণ পড়াশোনা করতে হয়, মোটামুটি ধর্ম জ্ঞান অর্জন করার জন্য আমাদের সনাতন ধর্মীয় টেক্সটগুলোর পরিমাণ তার চেয়ে বেশি নয়; তার মানে প্রতিদিন ২/৩ ঘন্টা করে যদি বছর খানেক আপনি ধর্ম পুস্তক পড়েন বাজারে চলার মতো ধর্মীয় জ্ঞান আপনি অনায়াসেই অর্জন করতে পারবেন; সুতরাং সাধু-সন্ন্যাসীদের ধর্মজ্ঞান দেখে নিজেকে ছোট ভাবার কোনো কারণ নেই। তবে বাজারে প্রচলিত সনাতন ধর্মের বই পুস্তক পড়লেই আপনি প্রকৃত সত্যের সন্ধান পাবেন না; কারণ, গীতার সাতশত শ্লোক ছাড়া সনাতন ধর্মের প্রতিটি গ্রন্থ কোনো না কোনো ভাবে বিকৃত, কোনো বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্তে আসার জন্য আপনাকে ঐ বিষয়ে বাজারে প্রচলিত সমস্ত গ্রন্থ দেখতে হবে এবং যুক্তি দিয়ে বিচার করে সেই বিষয়ে সিদ্ধান্তে আসতে হবে, তাহলেই আপনি প্রকৃত সত্যের সন্ধান পাবেন। আমি আমার প্রতিটি পোস্ট লিখি এই ভাবে সমস্ত গ্রন্থকে গুলে খেয়ে, তাই বেশি কষ্ট স্বীকার না করতে চাইলে, আপনি যদি প্রতিদিন আমার একটি করে পোস্ট বছর দুয়েক পড়েন, শুধু সনাতন ধর্মের প্রকৃত সত্যের সন্ধানই পাবেন না, পৃথিবীর এমন কোনো ধর্মগুরু নেই যে আপনাকে যুক্তি তর্কে পরাজিত করতে পারে বা আপনার ধর্মীয় জ্ঞানকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে।

যা হোক, সাধন বাবু তার কমেন্টের এক পর্যায়ে বলেছে, "ভেদজ্ঞানই অধর্ম, অভেদ জ্ঞানই ধর্ম।" আপনার এই কথা যে সত্য তাতে কোনো সন্দেহ নেই, কিন্তু আপনি এই কথা কাদের উদ্দেশ্যে বলছেন এবং কোন জাতির অংশ হয়ে আপনি এই্ কথা বলছেন, সেটা সম্ভবত আপনার বোধে নেই ।

আপনি কি জানেন, হিন্দু রাজা পৃথ্বীরাজ চৌহানের ক্ষমার সুযোগ নিয়ে মুসলমান মুহম্মদ ঘোরী পুনরায় শক্তি সঞ্চয় করে এবং সেই পৃথ্বীরাজ চৌহানকেই পরে পরাজিত করে এবং তাকে হত্যা করে, তারপর মুসলমানরা দিল্লীর ক্ষমতা দখল করে এবং একের পর এক হিন্দু রাজাকে পরাজিত ও হত্যা করে তাদের প্রজাদেরকে হত্যা করতে থাকে অথবা ইসলাম গ্রহনের শর্তে তাদেরকে জীবিত রাখে। মুহম্মদ ঘোরী থেকে শুরু করে টিপু সুলতান পর্যন্ত এই ৭/৮ শ বছর ধরে মুসলমানরা কোটি কোটি হিন্দুকে হত্যা করেছে, জোর করে তাদেরকে মুসলমান বানিয়েছে, নয় তো জিজিয়া করের বিনিময়ে তাদেরকে হিন্দু হিসেবে বাঁচতে দিয়েছে, এই্ সময় ভারতের এমন কোনো বড় মন্দির ছিলো না যেগুলোকে মুসলমানরা ধ্বংস করে নি বা সেগুলোকে মাদ্রাসা বা মসজিদে রূপান্তরিত করে নি, এদের সাপোর্ট দেওয়ার জন্য আপনি অভেদ জ্ঞানের কথা বলছেন ?

মধ্যযুগের কথা বাদ দিলেও, এই আধুনিক যুগে ১৯৪৬ সালে, ভারতের হিন্দুদের সাথে মুসলমানদের এক সাথে থাকা সম্ভব নয় বলে তারা আলাদা রাষ্ট্র পাকিস্তানের দাবী তোলে এবং সেই দাবী আদায়ে ১৬ থেকে ১৯ আগস্ট মাত্র আড়াই দিনে কোলকাতার প্রায় ২০ হাজার হিন্দুকে হত্যা করে, তারপর বর্তমান বাংলাদেশের নোয়াখালিতে ১০ থেকে ৩০ অক্টোবরের মধ্যে প্রায় হাজার খানেক হিন্দুকে তারা হত্যা করে, ১২ থেকে ৫২ বছরের প্রায় সকল হিন্দু নারীকে তারা ধর্ষণ করে এবং এবং জীবিত সকল হিন্দুকে তারা জোর করে মুসলমান বানায়, এদেরকে সাপোর্ট দেওয়ার জন্য আপনি অভেদ জ্ঞানের কথা বলছেন ?

এগুলো ছাড়াও, এই বাংলার টোটাল জনসংখ্যা এক সময় হিন্দু ছিলো, ১২০৪ সালে বখতিয়ার খিলজি বাংলায় আসার পর হিন্দুদের উপর সে এমন অত্যাচার নির্যাতন শুরু করে যে অত্যাচার থেকে বাঁচতে দলে দলে হিন্দু মুসলমান হতে বাধ্য হয়। শুধু তাই নয় ১৯৪৭ সালেও পূর্ব বাংলায় হিন্দু জনসংখ্যা ছিলো ২৯%, বর্তমানে সেটা ৯% এর নিচে, এত হিন্দু কি শখ করে ভারতে পালিয়ে গেছে ? শখ করে কি কেউ জন্মভূমি ত্যাগ করে ? যাদের অত্যাচারে হিন্দুদের মান সম্মান জন্মভিটা এবং জীবন বিপন্ন, সেই মুসলমানদেরকে সাপোর্ট দেওয়ার জন্য আপনি অভেদ জ্ঞানের কথা বলছেন ? মানুষের মধ্যে ভেদাভেদ করা অবশ্যই অধর্ম, কিন্তু জানোয়ার আর মানুষকে আপনি যদি এক করে ফেলেন, সেটাই ধর্ম নয়, সেটা অধর্ম। কোরান হাদিস এবং আচরণের বিচারে পৃথিবীর একজন মুসলমানও মানুষ নয়, জানোয়ার; সেই জানোয়ারদের প্রসঙ্গে আপনি অভেদ জ্ঞানের কথা কেনো বলছেন ? পাগলা কুকুরকে আপনি যদি না মারেন, পাগলা কুকুরই আপনাকে কামড় দেবে এবং তাতে আপনি মারা যাবেন। জানোয়ার মুসলমানদের বিরুদ্ধে আপনি যদি প্রতিরোধ গড়ে না তোলেন, আজ হোক বা কাল হোক, তারা আপনাকেই ছোবল মারবে, সুতরাং তাদের সাথে অভেদ জ্ঞান কেনো ? ছোবল খেয়ে মরার জন্য ? আমি ছোবল খেয়ে মরতে রাজী নই, তাই কোনো পাগলা কুকুর যদি আমাকে কামড়াতে আসে আমিও তাকে কামড় দিতে প্রস্তুত; কারণ, আমার অস্তিত্ব আমি টিকিয়ে রাখতে চাই; কেননা, আপনি মরে গেলেই আপনার সকল গল্প শেষ।

এরপর আপনি প্রশ্ন করেছেন, হিন্দুধর্মের কোথায় বলা আছে অন্যের বিশ্বাসে আঘাত করতে ?

পৃথিবীর ইতিহাসে এমন কোনো উদাহরণ নেই, যেখানে হিন্দুরা প্রথমে অন্য কাউকে আঘাত করেছে, কোনো কারণে; কিন্তু আক্রান্ত হওয়ার পরও কি আপনি বাঁচার জন্য আক্রমন করবে না ? এই বাংলায় মুসলমানরা প্রতিবছর কতগুলো মূর্তি ভাঙে এবং কত মন্দিরে আগুন লাগায়, সেই পরিসংখ্যান কি আপনি জানেন ? এগুলো কি হিন্দু ধর্মবিশ্বাসে মুসলমানদের আঘাত নয় ? কিন্তু বাংলার কোনো হিন্দু কি মুসলমানদের ধর্ম বিশ্বাসে আঘাত লাগে এমন কিছু করে ? করে না। তাহলে মুসলমানরা কেনো নিয়ম করে প্রতি বছর মূর্তি ভেঙ্গে চলেছে ? মুসলমানরা যখন হিন্দুধর্মে আঘাত করে, তখন সেটাকে আপনার ভেদজ্ঞান মনে হয় না ? আর আমি যখন শুধু তাদের অনাচারের বিরুদ্ধে লিখি, সেটাকে কেনো আপনার ভেদজ্ঞান মনে হয় ? সেকুলারগিরি ছেড়ে হিন্দু হোন, তাহলে শুধু নিজেকেই নয়, সমাজকেও বাঁচাতে পারবেন। আর সেকুলারগিরি মারালে আপনার ছেলে বা মেয়েই কোনো মুসলমানকে বিয়ে করে হিন্দুধর্ম ত্যাগ করে আপনার ভুলের উচিত শিক্ষা আপনাকে দিয়ে যাবে, কথাটা মনে রাইখেন।

শেষে আপনি বলেছেন, আপনি যদি আপনার প্রশ্নের জবাব আমার নিকট থেকে পান, তাহলে পরে আরো অগ্রসর হবেন।

আপনি কতদূর অগ্রসর হবেন ? আপনি যদি এক মাইল হাঁটার পরিকল্পনা করে থাকেন, মনে রাখবেন আমি ১০০ মাইল হেঁটে বসে আছি এবং আমার এই কথা সত্য কি না, সেটা আমাকে প্রশ্ন করে আপনি যাচাই করতে পারেন।
মহাভারতে একটি বাণী আছে- যে যা আচরণ করবে, তার সাথে সেই আচরণ করারই ধর্মনীতি। একারণেই ছলনার মাধ্যমে দুর্যোধনের বিজয়ী হওয়া দূতক্রীড়ার পরিণতি হিসেবে ঘটা কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে ছলনার মাধ্যমেই শ্রীকৃষ্ণ পাণ্ডবদের বিজয়ী করেছেন এবং ধর্ম প্রতিষ্ঠা করেছেন। আমি জানি প্রকৃত ধর্ম কী, তাই এমন লিখি, আপনি আমার কথার বিরোধিতা করেছেন, এর মানে হলো- ধর্ম কী, সেটা আপনি জানেন না; তাই মহাসমুদ্র শ্রীকৃষ্ণের উদাহরণ না টেনে বদ্ধ জলাশয় রামকৃষ্ণ পরমহংসের উদাহরণ টেনেছেন।

জয় হিন্দ।
জয় শ্রীরাম, জয় শ্রীকৃষ্ণ।

Thursday, 21 May 2020

প্রসঙ্গ : রাম কর্তৃক বালীকে আড়াল থেকে তীর মেরে হত্যা


প্রসঙ্গ : রাম কর্তৃক বালীকে আড়াল থেকে তীর মেরে হত্যা

রাম ছিলেন ভগবান, ঈশ্বর নন। এজন্যই বলা হয় ভগবান রামচন্দ্র, রামকে কখনো পরমেশ্বর রামচন্দ্র বলা হয় না, যেমন কৃষ্ণকে বলা হয় পরমেশ্বর শ্রীকৃষ্ণ। যশ, বীর্য, ঐশ্বর্য, শ্রী, জ্ঞান, বৈরাগ্য- এই ছয়টি গুনের অধিকারীকে বলে ভগবান, কিন্তু সকল গুনের অধিকারীকে বলে ঈশ্বর। ভগবানের ক্ষমতা সীমিত, কিন্তু ঈশ্বরের ক্ষমতা অসীম। একারণেই শ্রীকৃষ্ণের জীবনীতে দেখা যায় কোনো কিছুর জন্য শ্রীকৃষ্ণকে কখনো কারো পরমুখাপেক্ষী হতে হয় নি, ১০০কে সম্পূর্ণ হিসেবে ধরে নিয়ে বলা যায় তিনি একাই একশো। কিন্তু ভগবানের ক্ষমতা সীমিত বলে ভগবানরূপী অবতারদেরকে নানা কারণে নানাসময়ে অন্যের উপর নির্ভর করতে হয়েছে এবং এমন অনেক ঘটনা তাদের সাথে ঘটেছে, যা তাদের নিয়ন্ত্রণে ছিলো না বা তারা তা বুঝতে পারেন নি। যেমন - মহাভারতের কর্ণ যখন মিথ্যা বলে নিজেকে ব্রাহ্মণ পরিচয় দিয়ে পরশুরামের কাছে অস্ত্র শিক্ষা করতে যায়, তখন কর্ণ যে মিথ্যা বলছে, সেটা পরশুরাম বুঝতে পারে নি, এটা পরশুরামের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতার কারণেই সম্ভব হয়েছে। একইভাবে সীতা যে রাবন কর্তৃক হরণ হতে চলেছে, সেটাও রাম জানতে পারেন নি তার জ্ঞানের সীমাবদ্ধতার কারণে; শুধু তাই নয়, রাবন যে সীতাকে অপহরণ করে নিয়ে গেছে, সেই জ্ঞানও রামকে লাভ করতে হয়েছে জটায়ুর নিকট থেকে, তাই রাম অনেক দিক থেকেই অসম্পূর্ণ।

রাম যে কারণে বালীকে হত্যা করে সেই কাহিনীটা হলো- বানরদের রাজা বালী, সুগ্রীব তার ছোট ভাই। একদিন দুই ভাই মিলে এক মায়াবী রাক্ষসের সাথে যুদ্ধ করছিলো। এক পর্যায়ে রাক্ষস গিয়ে এক পাহাড়ের গুহার মধ্যে লুকায়। বালী, সুগ্রীবকে সেই গুহার মুখ পাহারা দিতে বলে রাক্ষসকে মারার জন্য গুহার মধ্যে ঢুকে, কিন্তু এক বছর অপেক্ষা করার পরও বালী গুহা থেকে বের হচ্ছে না দেখে সুগ্রীব মনে করে সে নিশ্চয় মারা গেছে, এখন এই রাক্ষস যদি গুহা থেকে বের হয়, তাহলে রাজ্যের নিশ্চয় অনেক ক্ষতি করবে। এই ভেবে সুগ্রীব বড় পাথর দিয়ে গুহার মুখ বন্ধ করে দিয়ে রাজপ্রাসাদে ফিরে আসে।

স্বামীর মৃত্যু হয়েছে মনে করে বালীর স্ত্রী ‘তারা’ বিধবার বেশ ধরে। বড় ভাই এর স্ত্রী এভাবে সারাজীবন বিধবা বেশে কাটাবে ? এই কথা ভেবে সুগ্রীব তার বৌদিকে বিয়ের প্রস্তাব দিলে বালীর স্ত্রী ‘তারা’ শাস্ত্রীয় নির্দেশ(অথর্ববেদ ১৮/৩/২, বিধবাদের পুনর্বিবাহ) মেনে পুনরায় সুগ্রীবকে বিয়ে করে রাজরানী হিসেবেই তার কর্তৃত্ব বজায় রাখে।

এই ঘটনার কিছুদিন পর, রাক্ষসকে মেরে বালী গুহার মুখে ফিরে দেখে গুহার মুখ বন্ধ এবং সুগ্রীবও সেখানে নেই। রাজপ্রাসাদে ফিরে বালী আরও দেখে সুগ্রীব রাজা হয়ে বসে আছে এমনকি তার স্ত্রী তারাকে সে বিয়ে করে নিয়েছে। বালি মনে করে রাজ্যের লোভেই সুগ্রীব পরিকল্পনা করে তাকে গুহার মধ্যে আটকে রেখে মেরে ফেলার জন্য ঐভাবে গুহার মুখ বন্ধ করে দিয়ে এসেছে। এরপর বালী, সুগ্রীবের কোনো কথা বিশ্বাস না করে তাকে রাজ্য থেকে তাড়িয়ে দেয় এবং সুগ্রীবের স্ত্রী রুমাকে বিয়ে করার জন্য রুমার উপর চাপ সৃষ্টি করে এবং রুমা রাজী না হলে তাকে বন্দী করে রাখে।

রাজ্য থেকে বিতাড়িত সুগ্রীব ঘুরতে ঘুরতে বনের মধ্যে রামের দেখা পায় এবং রামচন্দ্রকে সব খুলে বলে। ইতোপূর্বে রাবন সীতাকে অপহরণ করে নিয়ে গিয়ে লংকায় বন্দী করে রেখেছিলো এবং রাম তাকে উদ্ধারের চেষ্টা করছিলো। রাম বিবেচনা করে রাবনের মতো বালীও এক দূরাচারী, কেননা সে সত্যকে উপলব্ধি করার চেষ্টা না করে শুধু সন্দেহের বশে সুগ্রীবকে রাজ্য থেকে বিতাড়িত করেছে, এছাড়াও রাবণের সীতাকে বন্দী করে রাখার মতো বালীও সুগ্রীবের স্ত্রী রুমাকে বিয়েতে রাজী না হওয়ার জন্য বন্দী করে রেখেছে। এভাবে রামের চোখে রাবন ও বালী ছিলো সমান অপরাধী। তাই রাম, বালীকে রাবনের আগেই হত্যা করার সিদ্ধান্ত নেয়, একারণেই যে সুগ্রীব রাজা হলে লঙ্কা অভিযানের সময় সে তার সহায়তা পাবে, এই ঘটনাটিও রাম যে স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়, তা প্রমাণ করে।

যা হোক, এরপর রাম, বালীকে হত্যার পরিকল্পনা হিসেবে, সুগ্রীবকে বালির সাথে যুদ্ধ করতে পাঠায়; পরিকল্পনা হলো- সুগ্রীব ও বালি যখন যুদ্ধ করতে থাকবে, তখন রাম, আড়াল থেকে বালী কে তীর মেরে হত্যা করবে। কিন্তু সু্গ্রীব ও বালির বেশভূষা এবং চেহারা একই রকম হওয়ায় যুদ্ধ চলাকালীন, কোনটা সুগ্রীব এবং কোনটা বালী এটা বুঝতে না পারায় তীর নিক্ষেপ থেকে বিরত থাকে, ফলে সু্গ্রীবের কাছে পরাজিত হয়ে বালী পলায়ন করে; এই ঘটনাও রামের অসম্পূর্ণতারই প্রমাণ দেয়।

যা হোক, তারপর সুগ্রীবের দেহে একটি চিহ্ন লাগিয়ে দিয়ে, রাম, সুগ্রীবকে আবার বালীর সাথে যুদ্ধ করতে পাঠায়, এই বার রাম, বালীকে চিনতে পেরে, আড়াল থেকে তীর মেরে তাকে আহত করে। এরপর বালী, রামকে বলে-

"তুমি যদি প্রকাশ্যে আমার সঙ্গে যুদ্ধ করতে তবে আজই নিহত হতে। সুগ্রীবের প্রিয় কামনায় আমাকে মেরেছ, কিন্তু যদি আমাকে বলতে তবে একদিনেই মৈথিলীকে (সীতা) উদ্ধার করতাম, দুরাত্মা রাবনের কণ্ঠ বন্ধন করে তাকে তোমার কাছে জীবিত এনে দিতাম।... তুমি আমাকে যে অধর্মত বধ করলে তা নিতান্তই অনুচিত।"

এর জবাবে রাম, বালীকে বলে,

"তুমি ধর্ম, অর্থ, কাম ও লোকাচার না জেনে কেন আমার নিন্দা করছ ? এই শৈলকানন সমন্বিত দেশ ইক্ষ্বাকুগণের অধিকৃত, ধর্মাত্মা ভরত এর শাসনকর্তা, আমি এবং অন্য রাজারা ধর্মের প্রসার কামনায় তাঁর আদেশে পৃথিবীর সর্বত্র বিচরণ করছি। তুমি কাম পরায়ণ, রাজধর্ম পালন কর না, তোমার বিগর্হিত কর্মে ধর্ম পীড়িত হয়েছেন। কেন তোমাকে বধ করেছি, তার কারণ শোন। তুমি সনাতন ধর্ম ত্যাগ করে ভ্রাতৃজায়াকে গ্রহণ করেছ। তুমি পাপাচারী, মহাত্মা সুগ্রীব জীবিত আছেন, তাঁর পত্নী রুমা তোমার পুত্রবধূস্থানীয়া, কামবশে তুমি তাকে অধিকার করেছ। বানর, তুমি ধর্মহীন, কামাসক্ত, ভ্রাতৃবধূকে ধর্ষণ করেছ, এজন্য এই বধদণ্ড তোমার পক্ষে বিহিত।... তুমি জেনো যে ধর্মসংহত মহৎ কারণেই তোমাকে শাস্তি দিয়েছি। মনু বলেছেন, পাপী রাজদণ্ড ভোগ করলে নির্মল হয়ে পুন্যবান সাধুর ন্যায় স্বর্গে যায়, কিন্তু রা্জা যদি পাপীকে শাসন না করেন তবে স্বয়ং পা্পগ্রস্ত হন। তোমাকে আমি ক্রোধবশে হত্যা করি নি, বধ করে আমার মনস্তাপও হয় নি।... বানরশ্রেষ্ঠ, রাজা দেবতাস্বরূপ, তিনি প্রজাদের ধর্মরক্ষা, প্রাণরক্ষা ও শুভসাধন করেন, তাকে হিংসা বা নিন্দা করা বা অপ্রিয় কথা বলা উচিত নয়। তুমি ধর্মের তত্ত্ব না জেনেই আমার দোষ দিচ্ছ।

তখন বালী কৃতঞ্জলি হয়ে বললেন, নরশ্রেষ্ঠ তুমি যা বলেছ তা যথার্থ, আমি প্রমাদবশে পূর্বে যা বলেছি তার জন্য দোষ নিও না। তুমি আমাকে ক্ষমা করো।"

মহাভারতের যুদ্ধে, উভয়পক্ষ বসে যুদ্ধের একটা নিয়ম ঠিক করেছিলো, সেই নিয়ম প্রথম ভঙ্গ করেছিলো কৌরবরা, এর ফলে পাণ্ডবরাও কিছু নিয়ম ভঙ্গ করতে বাধ্য হয়। ফলে নিয়ম ভাঙ্গার দোষে উভয় পক্ষই দোষী হয়। এই প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন, "তাহলে কী পার্থক্য উভয় পক্ষের মধ্যে ? পার্থক্য শুধু উদ্দেশ্যে।" এর মানে হলো পাণ্ডবদের উদ্দেশ্যে যেহেতু ছিলো ন্যায় প্রতিষ্ঠা করা এবং সেই উদ্দেশ্যে যদি তারা কিছু নিয়ম ভাঙ্গেও, সেটা দোষের কিছু নয়। এই একই বিষয় প্রযোজ্য রাম-বালীর প্রসঙ্গেও। রাম, সর্বক্ষমতাসম্পন্ন ঈশ্বর ছিলেন না, তাই তার মধ্যে কিছু সীমাবদ্ধতা ছিলো, যে সীমাবদ্ধতার ফলে রাম, একাই রাবনকে যুদ্ধে পরাস্ত করতে পারবে না বিবেচনা করে সুগ্রীবের সহায়তা নেওয়ার পরিকল্পনা করে এবং যার কারণে অধর্মী বালীকে আড়াল থেকে তীর মেরে হত্যা করে। যদিও এই ঘটনার মধ্যে রামের বীরত্বের পরিচয়ের অভাব আছে, কিন্তু রামের উদ্দেশ্য ছিলো যেহেতু দুষ্টের দমন করা এবং সেটা যেকোনো কৌশলেই করা যেতে পারে, তাই এই ঘটনায় রামের কোনো দোষ নেই, সেটা বুঝতে পেরেই মৃত্যুর পূর্বে বালী, রামকে তার মৃত্যুর জন্য দোষ না দিয়ে রামের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে। এইভাবে রাম, বিষ্ণুর অবতার হিসেবে বালীকে উদ্ধার করে তার স্বর্গ প্রাপ্তির ব্যবস্থা করে।

রাম জানতো যে বালী শক্তিশালী এবং বালী যে রামকে বলেছিলো, তুমি যদি আমাকে বলতে তাহলে এক দিনেই রাবণকে হত্যা করে সীতাকে উদ্ধার করে নিয়ে আসতাম, এটাও সত্য এবং বালীর সেটা করার ক্ষমতা ছিলো। তারপরও রাম, বালীর সাহায্য না নিয়ে বালীকে হত্যা করতে গেলো কেনো ?

রাম একটা বিষয় জানতো যে বালী, রাবনের মতোই অধর্মী, দুরাচারী। তাই এক অধর্মীকে শাস্তি দিতে আরেক অধর্মীর সাহায্য নেওয়া কোনোভাবেই উচিত নয়; কারণ, এটা করলে পক্ষান্তরে অধর্মকেই প্রশ্রয় দেওয়া হয়; এজন্যই রাম, বালীর সাহায্য না নিয়ে দুষ্টের দমন এবং ধর্মের প্রতিষ্ঠার জন্যই বালীকে একটি ছলনার মাধ্যমে হত্যা করে।

বীরত্বের দিক থেকে হয় তো এটা দোষের, কিন্তু ধর্ম প্রতিষ্ঠার মহৎ উদ্দেশ্যের দিক থেকে এটা একটা জাস্ট কৌশল মাত্র এবং নিজের থেকে শক্তিশালী কোনো দুরাচারকে কিভাবে দমন করতে হয়, এটা সাধারণ মানুষের জন্য একটা শিক্ষাও।

রামচন্দ্র, শ্রী বিষ্ণুর অংশাবতার, তাই রাম, সকল প্রকার প্রশ্নের উর্ধ্বে থাকবেন, এমনটা আশা করা যায় না, তাই রামের জীবনে ঘটা অনেক বিষয়ে প্রশ্ন তোলা যায়; কিন্তু শ্রী বিষ্ণুর পূর্ণ অবতার হিসেবে শ্রীকৃষ্ণ হলেন সকল প্রশ্নের উর্ধ্বে, তাঁর জীবনের এমন কোনো ঘটনা নেই, যেখানে তাঁর চরিত্র, জ্ঞান এবং ক্ষমতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন তোলা যায়। যেসব প্রসঙ্গে শ্রীকৃ্ষ্ণকে নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায়, মনে রাখবেন সেই বিষয়টা হয় আপনি ভুলভাবে জানেন অথবা জানেন না। শ্রীকৃষ্ণকে সঠিকভাবে জানতে পারলে বুঝতে পারবেন আদর্শ হিসেবে শ্রীকৃষ্ণ হলেন শ্রেষ্ঠ। যদিও সকল অবতারের শিক্ষাই মানুষের জন্য আদর্শ, কিন্তু কেউ যদি শ্রীকৃষ্ণকে তাদের জীবনের সর্বোচ্চ আদর্শ হিসেবে মেনে চলে, কেউ যেমন তাকে শ্রীকৃষ্ণ বিষয়ে কোনো প্রশ্ন করে কখনো বিব্রত বা অস্বস্তির মধ্যে ফেলতে পারবে না; তেমনি তার জীবন সহজ, সরল ও সুন্দর হবে এবং সে মুক্তি বা মোক্ষপ্রাপ্তির দিকে এগিয়ে যাবে। এজন্য আদর্শ বা ইস্টদেব হিসেবে শ্রীকৃষ্ণকে আশ্রয় করাই বেস্ট।

জয় হিন্দ।
জয় শ্রীরাম, জয় শ্রীকৃষ্ণ।

Thursday, 7 May 2020

রামায়ণের ইতিবৃত্ত : ( পর্ব - ২)


(রামায়ণ সম্পর্কে প্রকৃত সত্য জানতে হলে পড়ুন এই প্রবন্ধটি)


এই সিরিজের প্রথম পর্বে রামায়ণ সম্পর্কে নানা বিষয়ে জানতে পেরেছেন, এবার দেখে নিন বাকি বিষয়গুলো, শুরুতেই দেখুন  সংস্কৃত রামায়ণের কোথায় কোথায় রাম সীতার মাংস ভোজনের কথা আছে:

অযোধ্যাকাণ্ডের ১৪ নং উপাখ্যান (শৃঙ্গবেরপুর- নিষাদরাজ গৃহ) সর্গ : ৪৯-৫২ তে এক জায়গায় রাম তার পিতার প্রধানমন্ত্রী সুমন্ত্র, যে রামকে বনে ছাড়তে গিয়েছিলো, তাকে বলছে, “আবার আমি কবে পিতা মাতার সঙ্গে মিলিত হয়ে সরযুতটের পুষ্পিত বনে মৃগয়া করবো ?” (ফটোপোস্টে যুক্ত পুস্তকের পৃষ্ঠা ১০৬)

যারা জানেন না, তাদের জন্য বলছি- মৃগয়া মানে শিকার করা, আর এই শব্দটি এসেছে মৃগ থেকে যার অর্থ হরিণ। প্রাচীন কালের রাজারা শুধু হরিণকেই শিকার করতো, তাই হরিণের প্রতিশব্দ মৃগ থেকে মৃগয়া শব্দের উৎপত্তি। আর রাজারা অন্যান্য হিংস্র প্রাণী বীরত্ব দেখানোর জন্য শিকার করলেও তৃণভোজী প্রাণী কিন্তু শিকার করতো শুধু মাত্র ভোজনের উদ্দেশ্যে। তাহলে রামের মৃগয়া করার উদ্দেশ্যটা নিশ্চয় বুঝতে পারছেন ? না পারলেও একটু পরেই সেটা আরো ভালোভাবে বুঝতে পারবেন। কা্রণ, এই উপাখ্যানেরই শেষের দিকে, উল্লিখিত পুস্তকের পৃষ্ঠা ১০৯ তে, সীতা গঙ্গার কাছে প্রার্থনা করে বলছে, আমরা যদি ঠিক ঠাক মতো বনবাস শেষ করে রাজ্যে ফিরে যেতে পারি, তাহলে, “তোমাকে সহস্র ঘট সূরা এবং মাংসযুক্ত অন্নের ভোগ দেবো।”

যে মাংস খায় না, তার পক্ষে কি মাংসের ভোগ দেওয়া সম্ভব ?

এই পৃষ্ঠাতেই এই উপাখ্যানের একেবারে শেষ অনুচ্ছেদে বলা আছে,

“কিছুকক্ষণ পর তারা সমৃদ্ধ শস্যসম্পন্ন বৎস্যদেশে উপস্থিত হলেন। সেখানে রাম লক্ষ্মণ- বরাহ (শুকর), ঋষ্য, পৃষত (কৃষ্ণসার হরিণ) এবং মহারুরু (শম্বর, এটা আমার অচেনা) এই চার প্রকার পশু বধ করে, তাদের পবিত্র মাংস নিয়ে ক্ষুধিত হয়ে সায়ংকালে বাসের নিমিত্তে বনে প্রবেশ করলেন।”

রাম-লক্ষ্মণ-সীতা যদি মাংসই না খায়, তাহলে তারা এই পশুগুলো হত্যা করলো কেনো ?

এরপর অযোধ্যাকাণ্ডের ১৫ নং উপাখ্যান, উক্ত পুস্তকের পৃষ্ঠা নং ১১১ তে বলা আছে, “এক ক্রোশ গিয়ে দুই ভ্রাতা বহু প্রকার পবিত্র মৃগ বধ করে এনে যমুনা তীরস্থ বনে ভোজন করলেন।”

এবং পৃষ্ঠা ১১২ তে বলা আছে- রাম, লক্ষ্মণকে বলছে,

“অতএব তুমি মৃগ বধ কর নিয়ে এসো। লক্ষ্মণ পবিত্র মৃগ বধ করে এনে তার মাংস অগ্নিপক্ব ও শোনিত শূন্য করে রামকে দিলেন।”

শুধু যে রাম লক্ষ্মণ সীতা ই মাংস খেতো, তাই নয়, খেতো ভরতও, তার প্রমান আছে, পৃষ্ঠা ১২৯ এ; সেখানে, রামের সাথে দেখা করে তাকে রাজ্যে ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য ভরত বনের মধ্যে এলে, গুহ নামক একব্যক্তির জনপদের কাছে ভরত শিবির ফেলে বিশ্রামের জন্য, খবর এবং পরিচয় পেয়ে সেই গুহ, মৎস্য-মাংস-মধু উপহার নিয়ে ভরতের সাথ দেখা করতে যায়।

সেগুলো যদি না খাওয়া হয়, তাহলে সেগুলো উপহার নিয়ে যাবে কেনো ?

গুহ এর ওখান থেকে ভরত যায় ঋষি ভরদ্বাজের আশ্রমে, সেখান ভরতের সাথের সকল সৈন্যসামন্তকে বলা হয়, “সূরাপায়িগন সূরা পান করো, বুভূক্ষিতগণ পায়স ও সুসংস্কৃত মাংস যা ইচ্ছা হয় খাও”(পৃষ্ঠা-১৩২)।অনেক কিছুর সাথে এখানে ভরতের লোকজনের আপ্যায়ণের জন্য ছিলো- ছাগবরাহের মাংস, মৃগ, ময়ূরকুক্কুটের(মুরগী) মাংস (পৃষ্ঠা-১৩৩)। এই তথ্যে এখানে পরিষ্কার যে, সেকালে ঋষিরাও মাংস খেতো, কেউ নিরামিষ ভোজী ছিলো না।

এরপর অরণ্যকাণ্ডের ১১ নং উপাখ্যান “মায়া মৃগ ও মারীচ বধ”, যে উপাখ্যানের ঘটনায় একটি সুন্দর হরিণ দেখে সীতা রামকে সেই হরিণ ধরে আনার জন্য বলেছিলো, সেই হরিণ ছিলো আসলেই একটি মায়া হরিণ, কিন্তু প্রচলিত ধারণা মতো সোনার হরিণ নয়, রামকে বিভ্রান্ত করার জন্য মারীচ এই হরিণের রূপ ধরেছিলো। যা হোক, এই উপাখ্যানের শেষে বলা আছে, শেষ পর্যন্ত সেই মায়া হরিণকে না পেয়ে “রাম অন্য মৃগ বধ করে মাংস নিয়ে আশ্রমের দিকে চললেন (পৃষ্ঠা-১৭৮)।”

রাম সীতা যদি মাংসই না খায়, তাহলে রাম, সীতার সেই পছন্দের হরিণকে ধরতে না পেরে অন্য হরিণ বধ করলো কেনো ?

শুধু তাই নয়, রাবন যখন সীতাকে অপহরণ করতে ছদ্মবেশে গেছে, তখন রাবনকে সীতা চিনতে না পেরে বলছে,

“আপনি একটু বিশ্রাম করুন, আমার স্বামী শীঘ্রই রুরু (হরিণ), গোধা (গোসাপ) বরাহ প্রভূতি পশু বধ করে নিয়ে আসবেন।”(পৃষ্ঠা-১৮২)

রাম সীতা যদি মাংসই না খায় তাহলে রাম এই পশুগুলো শিকার করবে কেনো এবং কেনো সীতা, একজন অতিথিকে মাংস খাওয়ানোর লোভ দেখাচ্ছে ?

এরপর সুন্দরকাণ্ডের নং উপাখ্যান, ‘সীতা হনুমান সংবাদ’ এ, হনুমান, সীতাকে খুঁজতে খুঁজতে পেয়ে রামের কী অবস্থা সেটা তাকে বোঝানোর জন্য বলছে, “তিনি মাংস খান না, মদ্য পান করেন না, কেবল বিহিত বন্য ফলমুল খান।” (পৃষ্ঠা-২৭৭)

সীতার শোকে রাম যে মাংস খাওয়া ছেড়ে দিয়েছে সেই কথা ই হনুমান এখানে সীতাকে বোঝাচ্ছে।

আশা করছি, রাম- সীতা যে নিরামিষভোজী ছিলো না, সেই বিষয়টি সবার কাছে পরিষ্কার হয়েছে। তারপরও যদি গোরক্ষপুরের গীতা প্রেস এর লোকজনের মতো আপনার এই ধারণা থাকে যে, না, রাম সীতার পক্ষে মাংস খাওয়া অসম্ভব। তাহলে রাজশেখর বসুর অনুবাদ করা এই রামায়ণটি আপনাকে কালেক্ট করে পড়তে হবে। কেউ কেউ এই প্রশ্নও তুলতে পারেন যে, রাজশেখর বসুই যে রামায়ণের সঠিক অনুবাদ করেছে, তার নিশ্চয়তা কী ? তাহলে তো আপনাকে এটা পড়তেই হবে। কারণ, পড়ার পরই আপনি বুঝতে পারবেন, অনুবাদ কী এবং অনুবাদ করা কাকে বলে ?

এবার কৃত্তিবাসী রামায়ণের কিছু মজার গল্প আপনাদের শোনাই :

“রামের লঙ্কা অভিযানের সময়, রাবনের মানসপুত্র অহিরাবন ছিলো পাতাল পতি এবং অহিরাবনের পুত্রের নাম মহীরাবন। রাম যখন রাবনের সৈন্যদের মেরে ছারখার করছিলো, তখন উপায় না দেখে রাবন তার অনুগত, অহিরাবন ও মহীরাবনকে তলব ক’রে রাম লক্ষ্মনকে হত্যার নির্দেশ দেয়। অহিরাবন তার মন্ত্রের শক্তি দ্বারা পাতাল থেকে রামের শিবিরে রামের ঘর পর্যন্ত সুড়ঙ্গ তৈরি করে এবং মন্ত্রের শক্তিতে রাম লক্ষ্মণ ক’রে অজ্ঞান করে পাতালে নিয়ে যায়। হনুমান যখন বুঝতে পারে যে রাম লক্ষ্মণকে অপহরণ করা হয়েছে, তখন সেই সুড়ঙ্গ পথেই হনুমান পাতালে নেমে মহিরাবনের মন্দিরে চলে যায় এবং সেখানে রাম লক্ষ্মণকে বন্দী অবস্থায় দেখতে পেয়ে দেবী পাতাল ভৈরবীর মূর্তির পেছনে গিয়ে লুকিয়ে থাকে। এরপর মহিরাবন সেখানে আসে এবং রাম লক্ষ্মণকে দেবীর কাছে বলি হওয়ার আদেশ দিয়ে প্রণাম করার ভঙ্গিতে হাড়িকাঠে মাথা রাখতে বললে- রাম বলে,

“আমরা তো রাজপুত্র, কোনোদিন কাউকে প্রণাম করি নি, সবাই আমাদেরকেই প্রণাম করতো, তাই কিভাবে প্রণাম করতে হয় সেটা আমরা জানি না, তুমি শিখিয়ে দাও।”

শুনে মহিরাবন বলে, “এই কথা, দাঁড়াও শিখিয়ে দিচ্ছি,” এই ব’লে মহিরাবন যেই প্রণামের ভঙ্গিতে হাড়িকাঠে মাথা রেখেছে, অমনি হনুমান মূর্তির পেছন থেকে বেরিয়ে এসে হাড়িকাঠের শিক আটকে দিয়ে এক কোপে মহিরাবনের গলা কেটে ফেলেছে, মহিরাবন শেষ।

এরপর অহিরাবন সহ অন্যান্যরা এলে তাদেরকেও রাম, লক্ষ্মণ ও হনুমান মেরে সাফ করে দেয়। এরপর কৃত্তিবাস, মৎস্য কন্যা বলে হনুমানের এক স্ত্রীর এবং মকরধ্বজ নামে এক পুত্রের আবির্ভাব ঘটায়, যে পুত্রের হাতে পাতাল শাসনের ভার দিয়ে রাম-লক্ষ্মন-হনুমান ফিরে আসে; এখানে রামের মুখে বলানো-“আমরা তো রাজপুত্র, কোনোদিন কাউকে প্রণাম করি নি, সবাই আমাদেরকেই প্রণাম করতো, তাই কিভাবে প্রণাম করতে হয় সেটা আমরা জানি না, তুমি শিখিয়ে দাও”- এটা পড়ার পর আমার মনে হলো, এ্যাডাল্ট সিনেমাগুলোতে যেমন সতর্কবাণী থাকে যে প্রাপ্তবয়স্ক অর্থাৎ ১৮ বছরের নিচের কারো দেখা নিষেধ, তেমনি কৃত্তিবাসের রামায়ণের উপর লিখে দেওয়া দরকার যে,

“ছোটদের রামায়ণ, ১০ বছরের উর্ধ্বের কেউ পড়বেন না।”

কারণ, কেচ্ছার মতো ঐ গল্প বড়দের জন্য নয়, শিশুদের জন্যই মানায় ভালো। বিয়ে শাদী করা প্রাপ্ত বয়স্ক একজন লোক বলছে যে, ‘প্রণাম কিভাবে করতে হয় আমরা জানি না’, আর সেটা আরেক প্রাপ্ত বয়স্ক রাজা বিশ্বাস করছে; কৃত্তিবাস এখন বেঁচে থাকলে এসব লেখার জন্য পাবলিকের মার খেয়ে হাত পা ভেঙ্গে ওকে হসপিটালে ভর্তি হতে হতো।

যা হোক, রামায়ণ নিয়ে আরো কিছু কথা না বললেই নয়- রামায়ণ, মহাভারতের মতো নির্ভুল গ্রন্থ নয়। এখানে সংখ্যাতত্ত্বেরবেশ কিছু ভুল ভ্রান্তি আছে। যেমন- যুদ্ধকাণ্ডের নং উপাখ্যানে বলা আছে,

“সমুদ্রের উপর সীমন্তরেখার ন্যায় শোভমান এই সেতুপথে সহস্র কোটি বানর লাফাতে লাফাতে সগর্জনে পার হতে লাগলো।”

এই বানররা যে বানর ছিলো না, ছিলো মানুষ, সেটা একটু পরেই আপনার বুঝতে পারবেন, এখানে শুধু সংখ্যাটা খেয়াল রাখুন, সহস্র কোটি মানে হাজার কোটি; এখনও সারা পৃথিবীর মানুষের সংখ্যা ১ হাজার কোটি নয়, অথচ এই হাজার কোটি বানর সমুদ্র পার হয়ে লংকার মতো একটি ছোট দ্বীপে থাকতে পারছে! শুধু তাই নয়, রাবন যখন রামের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে আসে, তখন সে কী কী নিয়ে যুদ্ধ করতে আসে দেখুন- এক নিযুত(১০ লক্ষ) রথ, তিন নিযুত (৩০ লক্ষ) হস্তী, ষাট কোটি অশ্ব, ও অসংখ্য পদাতিক সৈন্য (পৃষ্ঠা-৩৬৯)। ১০ লক্ষ রথে কমপক্ষে ২০ লক্ষ মানুষ ছিলো; কারণ, একজন রথ চালায় এবং অন্যজন যুদ্ধ করে; একইভাবে ৩০ লক্ষ হাতিতেও কমপক্ষে ৬০ লক্ষ মানুষ ছিলো, তারপর ষাট কোটি ঘোড়ায় ৬০ কোটি মানুষ; এভাবে রাবনের বাহিনীতে ছিলো প্রায় ৬১ কোটি মানুষ এবং তাদের রথ, হাতি ও ঘোড়া। খেয়াল করবেন, রাম ও রাবনের এই সমগ্র বাহিনী কিন্তু যুদ্ধ করছে লংকার মতো একটি ছোট্ট দ্বীপে, এটা কি সম্ভব ?

রাজশেখর বসুর অনুবাদের সত্যতা নিয়ে যাদের সন্দেহ আছে, তাদের জন্য এখানে আছে একটা সুস্পষ্ট ইঙ্গিত, অনুবাদ হয় এইরকমই, যেখানে ব্যক্তিগত লাভালাভ বা উদ্দেশ্য সাধনের জন্য সত্যকে বিকৃতি বা চাপা দেওয়া হয় না। বসু মহাশয় চাইলেই এই সংখ্যাগুলোকে কম করে লিখে একটা বাস্তব রূপ দিতে পারতেন, কিন্তু তিনি সেই চেষ্টা করেন নি, যা পেয়েছেন তাই লিখেছেন। এই একই কারণে কোরানের বাংলা অনুবাদ যদি আপনারা গিরিশের টা না পড়েন, প্রকৃত সত্যের নাগাল কখনো পাবেন না। কারণ, গিরিশ, কোরান অনুবাদ করেছিলেন নিজের লাভালাভের কথা চিন্তা না করে; কিন্তু পরে যে সব মুসলমান কোরান অনুবাদ করেছে, তাদের সবার মাথায় ছিলো বেহেশতের ৭২ হুরের চিন্তা।

এছাড়াও, রামায়ণ পড়লে, রামের বনবাস এবং যুদ্ধকালীন, শুধু রাম-সীতা এবং লক্ষ্মণকেই আপনি মানুষ হিসেবে পাবেন, আর তাদের আশে পাশে যাদেরকে পাবেন, তারা সবাই বানর, রাক্ষস ইত্যাদি। রাক্ষস বলতে প্রকৃতপক্ষে কিছু নেই, আছে রাক্ষস স্বভাবের মানুষ; সেই হিসেবে রাবনের পক্ষের সবাই রাক্ষস স্বভাবের মানুষ। কিন্তু বিভীষণ সেই রাক্ষস স্বভাবের উর্ধ্বে ছিলো বলেই তাকে আমরা সুসংস্কৃত মানুষ হিসেবে বিবেচনা করি, যদিও তিনি রাক্ষসকূলজাত। বিভীষণ যদি প্রকৃতই রাক্ষস হতো বা রাক্ষস বলে যদি আলাদা প্রজাতির কোনো প্রাণী থাকতো, তাহলে বিভীষণ মানুষের মতো বিচার বুদ্ধি বা আচরণ করে কিভাবে ?

এরপর বালী-সুগ্রীবের কাহিনী যখন আপনি পড়বেন, তখন আপনার মনেই হবে না যে, তারা বানর; কারণ, তাদের রাজ্য আছে, রাজত্ব আছে, তারা মানুষের মতো কথা বলে, তাদের স্ত্রী সন্তান আছে, তাদের বসবাস করার জন্য নগর, দালান- ইমারত আছে। যদি তারা প্রকৃতপক্ষে বানর হতো, তাহলে তারা কি এসব নির্মান করতে পারতো, না তাদের জীবনে এসবের প্রয়োজন হতো ? আর বানর হিসেবে এইরকম বুদ্ধিবৃত্তিক উৎকর্ষই বা কিভাবে সম্ভব ? এই প্রশ্নের উত্তর কখনোই বুঝতে পারবেন না যতক্ষণ না আপনি, প্রাচীন যুগের মানুষের গোত্র বিভাগ কিভাবে হয়েছিলো, সেই ইতিহাস না জানবেন।

আমরা অনেক হিন্দুরই নামের শেষে পদবী হিসেবে লাগানো দেখি সিংহ (Lion), কারো নামের সাথে নাগ (সাপ) বা কারো সাথে সেন (শ্যেন, বাজ পাখি)। কিন্তু এগুলো কেনো ? যাদের নামের সাথে সিংহ লাগানো আছে তারা কি প্রকৃত পক্ষেই সিংহ, বা যাদের নামের সাথে নাগ আছে, তারা সাপ ? আসলে তারা প্রকৃত সিংহ, সাপ বা বাজপাখি নয়। প্রাচীন কালে এক গোত্রের মানুষের থেকে অন্য গোত্রের মানুষকে আলাদা করার জন্য পশু পাখিদের নামে তাদের নামকরণ করা হয়েছিলো, শুধু কোন গোত্রের মানুষ, তা আলাদা করে চিহ্নিত করার জন্য। বানর রাজ সুগ্রীব বা বালি বলতে বানরদের রাজাকে বোঝায় না, এরা আসলে বানর গোত্রের মানুষদের রাজা। তাই রামায়ণে বানর, রাক্ষস বলতে যাদেরকে বোঝানো হয়, আসলে এরা কেউ প্রকৃত অর্থে বানর বা রাক্ষস নয়, সবাই মানুষ, তবে ভিন্ন গোত্র বা ভিন্ন ধরণের। একই কথা প্রযোজ্য হুনুমানের ক্ষেত্রেও, হুনুমান হয়তো ছিলো হুনুমান গোত্রের কোনো শক্তিশালী মানুষ, কবির হাতে পড়ে যে হুনুমান হয়ে উঠেছে অলৌকিক শক্তিধর।

জয় হিন্দ।
জয় শ্রীরাম, জয় শ্রীকৃষ্ণ।


পরিশিষ্ট : রামচন্দ্রের জন্ম তারিখ

ভারতের হায়দরাবাদে অবস্থিত ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্টিফিক রিসার্চ অন ভেদাজ বা সংক্ষেপে আই-সার্ভ নামের গবেষণা সংস্থার গবেষকরা প্ল্যানেটোরিয়াম সফ্টওয়্যারের সাহায্যে গবেষণা চালিয়ে জানিয়েছেন, ৫১১৪ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে ১০ জানুয়ারি বেলা ১২টা থেকে টার মধ্যে অযোধ্যায় জন্মগ্রহণ করেছিলেন রামচন্দ্র।

রামায়ণের ইতিবৃত্ত : ( পর্ব - ১ )


(রামায়ণ সম্পর্কে প্রকৃত সত্য জানতে হলে পড়ুন এই প্রবন্ধটি)

রামায়ণ নিয়ে হিন্দু সমাজে বেশ কিছু ভ্রান্ত ধারণা প্রচলিত, আর এই ভ্রান্ত ধারণার মূল কারণ বাংলায় রামায়ণের মোটামুটি সফল অনুবাদকারী কৃত্তিবাস ওঝা। কারণ, তিনি যখন রামায়ণ অনুবাদ করেছিলেন, তখন সংস্কৃত মূল রামায়ণ থেকে বহুদূরে সরে গিয়ে ইচ্ছামতো যা খুশি তা লিখে গিয়েছেন, যা পড়ে এবং বিশ্বাস ক’রে হিন্দু সমাজ হয়েছে বিভ্রান্ত এবং কখনো কখনো বিব্রত।

উদাহরণ হিসেবে প্রথমেই বলা যায়, রাবন বধের পূর্বে রাম কর্তৃক দুর্গা পূজা করার কথা, যার ফলে সমগ্র বাংলায়- দুর্গা পূজা, সময় থেকে অসময়ে এসে অকালবোধন নামে চৈত্র মাসের পরিবর্তে আশ্বিন মাসে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। কিন্তু সংস্কৃত রামায়ণে রাম কর্তৃক দুর্গা পূজা করার কোনো কথা ই নেই। কিন্তু যেহেতু কালিকাপুরাণবৃহদ্ধর্মপুরাণে রামের দুর্গা পূজার কথা উল্লেখ ছিলো, তাই কৃত্তিবাস তার রামায়ণে রামকে দিয়ে দুর্গা পূজা করিয়ে তা বাঙ্গালিদের মধ্যে ছড়িয়ে দিয়েছেন।

রামায়ণ সম্পর্কে আরও একটা মিথ্যাচার হলো- বলা হয় রামের জন্মের ৬ হাজার বা ৬০ হাজার বছর পূর্বে বাল্মীকি মুনি রামায়ণ রচনা করেছেন। কিন্তু প্রকৃত সত্য হচ্ছে- বাল্মীকি মুনি, রামের সমসাময়িক এবং লংকার যুদ্ধ শেষে রাম অযোধ্যায় ফিরে আসার পর রামায়ণ লেখা শুরু হয়। বাল্মীকি মুনি যে রামের সমসাময়িক তার প্রমান হলো- রাম যুদ্ধ শেষ করে অযোধ্যায় ফিরে পরে যখন সীতাকে আবার বনবাস দেয়, তখন সীতা বাল্মীকি মুনির আশ্রমে ছিলো, সেখানেই তার দুই পুত্রের জন্ম হয় এবং বাল্যকাল কাটে। বাল্মীকি মুনি যদি রামের তথাকথিত ৬ হাজার বা ৬০ হাজার বছর পূর্বে রামায়ণ লিখে থাকেন, তাহলে রামের সময় তিনি জীবিত থাকলেন কিভাবে ? বাল্মীকি মুনি একজন মানুষ, মানুষ হিসেবে জন্ম নিয়ে কেউ কি পৃথিবীত এতদিন জীবিত থাকে ?

বাল্মীকি মুনি, কিভাবে বাল্মীকি মুনি হলো, সেই গল্প বলতে গিয়ে রত্নাকর দস্যুর কাহিনী প্রসঙ্গে বলা হয়, রত্নাকর দুস্যুই পরবর্তী বা শেষ জীবনে হয় উঠেন বাল্মীকি মুনি এবং তিনি নাকি রাম নাম করেই এই মুক্তি লাভ করেন। কিন্তু বাল্মীকি মুনি ছিলেন বয়সে রামের চেয়ে কিছুটা সিনিয়র। তার মানে রামের যখন জন্মই হয় নি, তখন বাল্মীকি মুনি ছিলেন, তাহলে যার জন্মই হয় নি, তার নাম সেই সময় কোথা থেকে আসবে এবং রত্নাকর দস্যু কিভাবে রাম নাম জপ করে বাল্মীকি মুনিতে পরিণত হবেন ? রাম নামের মহিমার কথা সমাজে ছড়িয়ে পড়েছে বাল্মীকি মুনির রামায়ণ গ্রন্থের কারণেই।

রামায়ণ সম্পর্কে আর একটা কথা বহুলভাবে প্রচলিত যে, সাতকাণ্ড রামায়ণ। কিন্তু রামায়ণ কি প্রকৃতপক্ষে সাতকাণ্ড ? যে সাত কাণ্ডের কথা বলা হয়, সেই নামগুলো হলো-

১। বালকাণ্ড
২। অযোধ্যাকাণ্ড
৩। অরণ্যকাণ্ড
৪। কিষ্কিন্ধ্যাকাণ্ড
৫। সুন্দরকাণ্ড
৬। যুদ্ধকাণ্ড এবং
৭। উত্তরকাণ্ড

এ প্রসঙ্গে রাজশেখর বসু, যিনি বাল্মীকির সংস্কৃত রামায়ণকে বাংলায় গদ্যে অনুবাদ করেছেন, তিনি তার গ্রন্থের ভূমিকায় বলেছেন,

“বর্তমান বাল্মীকি রামায়ণের কতক অংশ পরে জুড়ে দেওয়া হয়েছে, যেমন উত্তরকাণ্ড। যুদ্ধকাণ্ডের শেষে রামায়ণ মাহাত্ম্য আছে, তাতেই প্রমান হয় যে মূল গ্রন্থ সেখানেই সমাপ্ত।”

এই উত্তরকাণ্ডেই আছে সীতার বনবাস এবং পরে যখন রাম আবার সীতাকে নিতে চায় তখন সবার প্রতি অভিমানে সীতার ভূগর্ভে প্রবেশ; এই বিষয়গুলোকে সত্য বলে মনে হয় না এই কারণে যে, একবার সীতার অগ্নিপরীক্ষা নিয়ে রাম তাকে গ্রহন করেছিলেন, তাহলে পরে আবার কেনো রাম, সীতাকে বনবাস দেবেন ? রাম চরিত্রের এই দ্বিচারিতাই প্রমান করে, রামায়ণের উত্তরকাণ্ড, বাল্মীকি কর্তৃক রচিত নয়, পরে এগুলো কেউ রচনা করে বাল্মীকির মূল রামায়ণের সাথে জুড়ে দিয়েছে এবং তখন থেকে চলছে বাল্মীকির নামে সাত কাণ্ড রামায়ণ। উত্তরকাণ্ড যে পরে রচিত, এমন কি সেটা মহাভারতেরও পরে, তার প্রমান আছে মহাভারতেই; কারণ, মহাভারতে যে রাম উপাখ্যান আছে, তারও কাহিনী, রামের সীতা উদ্ধার পর্যন্তই শেষ। সুতরাং যুদ্ধ শেষে অযোধ্যায় ফেরার পর সীতার প্রতি রামের সন্দেহ এবং সীতার বনবাস পরবর্তী কাহিনী, যার জন্য রামকে অনেকেই অভিযুক্ত করে এবং তার সমালোচনা করে, সেটা সত্য নয় বলেই প্রমাণিত হয়।

যা হোক, সংস্কৃত থেকে বাংলা গদ্যে অনুবাদ করা সময় কৃত্তিবাস ওঝা, রামায়ণের কী কী সর্বনাশ করেছেন এবার সেদিকে নজর দেওয়া যাক :

কৃত্তিবাস, রামায়ণ অনুবাদ করার সময় মূল রামায়ণ থেকে অনেক দূরে সরে গিয়ে যা খুশি তাই রামায়নের মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়ে হিন্দু সমাজের বারোটা বাজিয়ে দিয়ে গেছে। অহিরাবণ মহীরাবনের পাতালের ঘটনা, বীরবাহুর বীরত্ব ও যুদ্ধ, তরণী সেনের কাহিনী, রামের অকাল বোধন, হনুমান কর্তৃক রাবণের মৃত্যুবাণ হরণ, সীতার রাবণমূর্তি অঙ্কন, মৃত্যুপথযাত্রী রাবণের কাছে রামের শিক্ষা, লব ও কুশের যুদ্ধ সব কৃত্তিবাসের বানানো, এগুলোর একটিও সংস্কৃত রামায়ণে নেই। এভাবে কৃত্তিবাসের রাম, ত্রেতাযুগের কোনো ত্রাতা নয়, বিষ্ণুর কোনো অবতার নয়, এক পিতৃপরায়ণ সন্তান ও স্নেহপরায়ণ পিতা এবং একই সঙ্গে দ্বিধাগ্রস্ত ও সন্দেহে পর্যুদস্ত এক স্বামী । এ থেকে খুব সহজেই উপলব্ধি করা যায় যে, কৃত্তিবাস- রামায়ণ অনুবাদ কালে বাল্মীকির প্রধান প্রধান কয়েকটি আখ্যান ও উপাখ্যান গ্রহণ করলেও সেগুলোকে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করতে গিয়ে রচনার শুরু থেকেই অগাধ স্বাধীনতা নিয়েছে এবং নিজের প্রয়োজনে বাল্মীকি থেকে বহু দূরে সরে গিয়ে নিজের ইচ্ছা মতো যা খুশি তাই লিখেছেন। কৃত্তিবাসের এই স্বেচ্ছাচারী মনোভাবকে বুঝতে পেরেই মনে হয় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচনা করেছিলেন,

‘সেই সত্য যা রচিবে তুমি, ঘটে যাহা তাহা সব সত্য নহে।
কবি, তব মনোভূমি, রামের জন্মস্থান, অযোধ্যার চেয়ে সত্য জেনো।’


যদিও এই কথাটি বলেছিলেন নারদ, বাল্মীকিকে; কারণ, রাম-রাবনের যুদ্ধ শেষ হলে নারদ এই ইতিহাসটি বাল্মীকিকে রচনা করার জন্য অনুরোধ জানালে, বাল্মীকি বলেছিলেন, আমি তো সবটা জানি না, যদিও তার নাম এবং তার কীর্তিকাহিনী শুনেছি, কিন্তু সবটা না জেনে লিখে যদি সত্যভ্রষ্ট হই ? সেই ভয় আমার আছে, তখন নারদ বাল্মীকিকে বলেছিলেন,

‘সেই সত্য যা রচিবে তুমি,….’

এই একই কথা কৃত্তিবাস সম্পর্কেও সত্য।

এর মাধ্যমে এখানে আরেকটি বিষয় স্পষ্ট হয় যে, রত্নাকর দস্যুর বাল্মীকি হয়ে উঠার কাহিনী সম্পূর্ণ মিথ্যা; কারণ, বাল্মীকিকে নারদ যখন রামের ইতিহাস লিখতে বলেন, তখন বাল্মীকি বলেন, “আমি রামের নাম এবং তার কীর্তিকথা শুনেছি, কিন্তু সবটা জানি না”, রত্নাকর দস্যু যদি রাম নাম জপ করে বাল্মীকি মুনিতে পরিণত হতেন, তাহলে কি তিনি এই কথা বলতে পারতেন ?

কৃত্তিবাস তো নিজের ইচ্ছামতো রামায়ণকে অনুবাদ করে যা তা কাহিনী ঢুকিয়েছেই, কিন্তু কৃত্তিবাস যেখানে মূল রামায়ণের কাহিনীকেই অনুসরণ করেছেন, সেখানেও তিনি কিভাবে রামায়ণকে বিকৃত করার চেষ্টা করেছেন, তার একটি উদাহরণ দেখুন নিচে-

সংস্কৃত রামায়ণে, সীতাকে যখন রাবন ধরে নিয়ে যায়; তখন সীতা, রাবনের সাথে ভয়ংকরভাবে সাহসের সাথে তর্ক বিতর্ক করে। কিন্তু কৃত্তিবাসী রামায়ণে ঐ সময়ে সীতা একজন ভীরু ও দুর্বল মহিলা। কৃত্তিবাসী রামায়ণে রামের চরিত্রও দুর্বল করে দেখানো হয়েছে এবং তাকে নপুংসক হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। কেননা, কৃত্তিবাসী রামায়ণে, রামের চরিত্র নিয়ে এই প্রশ্ন উত্থাপন করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে যে, রাম-সীতা বনে ১২ বছর এক সাথে থাকার পরেও কেনো সীতা গর্ভবতী হলো না ? কিন্তু সংস্কৃত রামায়ণের এই তথ্যকে সুকৌশলে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে যে, বনবাসে যাওয়ার আগেই রাম সীতা প্রতিজ্ঞা করেছিলো, বনে গিয়ে তারা কোনো ভোগ-বিলাসে মত্ত হবে না; তারা বনবাসকালীন ব্রহ্মচর্য পালন করবে। তো যারা ব্রহ্মচর্য পালন করবে, তাদের সন্তান হবে কিভাবে ?

মাইকেল মধুসূদন দত্ত, ‘মেঘনাদবধ’ কাব্য লিখে বাংলা সাহিত্যে অমর হয়ে আছেন। কিন্তু তিনি এই কাব্য লিখেছিলেন হিন্দু সমাজ ও রামের প্রতি ভালোবাসা থেকে নয়, রাবন ও মেঘনাদের প্রতি ভালোবাসা থেকে; কারণ, তার কাছে রাবন ও মেঘনাদ ছিলো হিরো এবং রাম-লক্ষ্মণ ছিলেন ভিলেন; তাই রাম লক্ষ্মণের প্রতি প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য তিনি রচনা করেন মেঘনাদবধ কাব্য। মাইকেলের এই যে ভুল বুঝে ভিলেন কে নায়ক আর নায়ককে ভিলেন ভাবা বা বানানো, এর কারণও কৃত্তিবাস।

ঘটনাটি এরকম : মাইকেল তখন হিন্দু ধর্ম ত্যাগ করে খ্রিষ্টান ধর্ম গ্রহন করে বাড়ি তথা কোলকাতা থেকে বিতাড়িত, খ্রিষ্টান পাদ্রীদের প্রতারণায় তখন তার ইংল্যান্ড যাওয়াও হয় নি; এখানে উল্লেখ্য যে, মাইকেলের খ্রিষ্টান হওয়ার মূল কারণই ছিলো ইংল্যান্ড নিয়ে যাওয়া বা পাঠানোর শর্ত। কারণ, মাইকেলের বাপের সামর্থ্য থাকলেও, মাইকেল বিদেশে গেলেই কোনো ইংরেজ মেয়েকে বিয়ে করবে, এই ভয়ে তার বাপ তাকে বিদেশ পাঠাতে রাজী ছিলো না; কিন্তু মাইকেলের আজীবনের লালিত স্বপ্ন সে ইংল্যান্ড যাবে এবং ইংরেজিতে কাব্য চর্চা করে সারা পৃথিবীতে বিখ্যাত হবে; এই জন্যই মাইকেল খ্রিষ্ট ধর্ম গ্রহণ করে, যার মূল শর্তই ছিলো তাকে ইংল্যাল্ড পাঠাতে হবে; কিন্তু খ্রিষ্ট ধর্মে দীক্ষা দেওয়ার পর পাদ্রীদের সেই ব্যাপারে আর কোনো আগ্রহ ছিলো না; শেষ পর্যন্ত মাইকেল গিয়ে স্থিতু হয় গুজরাটে এবং সেখানে অন্য এক পাদ্রীর মেয়েকে বিয়ে করে সংসার করার এবং ইংরেজিতে সাহিত্য চর্চার চেষ্টা করে।

এই চেষ্টারই ফল স্বরূপ মাইকেল ইংরেজিতে রচনা করে ‘দ্য ক্যাপটিভ লেডি’ এবং আরো কিছু সনেট। কিন্তু সেগুলোর সমালোচনা করতে গিয়ে ইংরেজরা যখন বলে, মাইকেলের মতো লোকেদের উচিত মাতৃভাষায় কাব্য রচনা করা, তখন ইংরেজিতে কাব্য চর্চা করে কিছু করা যাবে না মনে করে মাইকেল বাংলার দিকে মন দেয় এবং কোলকাতায় থাকা তার এক বন্ধুকে চিঠি লিখে কিছু বাংলা বই পাঠাতে বলে; তখন বাংলা সাহিত্যের তেমন বইও ছিলো না; কারণ, তখন না ছিলো রবীন্দ্রনাথ, না ছিলো বঙ্কিম; তাই বই বলতে মধ্যযুগে অনুবাদ করা কিছু বই এবং মঙ্গলকাব্য। সেজন্য কোলকাতার সেই বন্ধু যেসব বই তাকে পাঠিয়েছিলো, তার মধ্যে একটি ছিলো এই কৃত্তিবাসী রামায়ণ এবং এই কৃত্তিবাসী রামায়ণের সকল কথা বিশ্বাস ক’রে অন্য সকল হিন্দুর মতো মাইকেলও হয়েছিলো বিভ্রান্ত; তাই বই পাঠানোর পরে, সেই বন্ধুকে মাইকেল চিঠি লিখে জানিয়েছিলো, লক্ষ্মণ যেভাবে কাপুরুষের মতো বিভীষণের সহায়তায় আড়াল থেক তীর মেরে মেঘনাদকে হত্যা করেছে, এর প্রতিশোধ আমি নেবো; আমি এই ঘটনা নিয়ে একটি মহাকাব্য লিখবো।

সেই মহাকাব্যই হলো মেঘনাদবধ কাব্য, এটা এক দিকে বাংলা সাহিত্যের প্রথম মহাকাব্য এবং এখন পর্যন্ত একমাত্র সার্থক মহাকাব্য; এছাড়াও এটির মাধ্যমে রাম লক্ষ্মণের চরিত্রকে খাটো করে হিন্দু সমাজকে দমন করা যায় ব’লে বিশ্ববিদ্যালয় লেভেলে বাংলা বিভাগে পড়ানোর জন্য মুসলমানদের কাছে এটি একটি পছন্দের কাব্য, যেমন পছন্দের কাব্য বড়ুচণ্ডীদাসের শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্য; কারণ, এর মাধ্যমে হিন্দু ধর্মের প্রধা্ন পুরুষ কৃষ্ণকে লম্পট হিসেবে প্রমান করা যায়।

যা হোক, মাইকেলের কেনো এত রাগ ছিলো লক্ষ্মণের উপর, যে কারণে ভিলেন রাবন এবং তার ছেলে মেঘনাদ তথা ইন্দ্রজিৎ তার কাছে হয়ে উঠলো হিরো এবং রাম ও লক্ষ্মণ তার কাছে হয়ে গেলো ভিলেন !

কৃত্তিবাসের রামায়ণ পড়ে, বাংলাদেশের নাস্তিকজগতের একটি বিখ্যাত নাম এবং নাস্তিকদের গুরু আরজ আলী মাতুব্বর, তার একটি লেখা ‘রাবনের প্রতিভা’য় এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে যে, রাম ছিলো সন্তান জন্ম দানে অক্ষম, কারণ বনবাসে এক সাথে ১২ বছর থাকলেও সীতার গর্ভে রাম কোনো সন্তানের জন্ম দিতে পারে নি; কিন্তু সীতাকে উদ্ধার করে আনার পর অগ্নিপরীক্ষা, যাকে আরজ আলী বিবেচনা করেছে কঠোর জিজ্ঞাসাবাদ হিসেবে, যাতে সীতা কিছুতেই স্বীকার করে নি যে রাবন তার সাথে কী করেছে, সেই অগ্নিপরীক্ষা দিয়ে সীতা নিজেকে নিষ্কলঙ্ক প্রমান করলেও পরে যখন সীতার গর্ভলক্ষণ প্রকাশ পায়, তখন রাম প্রকৃত সত্য অর্থাৎ সীতার গর্ভের সন্তান যে রাবনের ই এটা বুঝতে পেরে সীতাকে আবার বনবাসে পাঠায়।

কিন্তু প্রকৃত ব্যাপার হচ্ছে, সীতাকে উদ্ধার করে আনার পর প্রায় বছর খানেক কেটে গেছে, রাম এই ফাঁকে রাজ্যটাকে গুছিয়ে নেবার চেষ্টা করছে, কিন্তু তখনও সীতার গর্ভের লক্ষ্মণের কোনো খবর নেই, রাবন যদি সীতার সন্তানের পিতা হতো, তাহলে অযোধ্যায় ফেরার পর পরই তা অবশ্যই প্রকাশ পেয়ে যেতো। কিন্তু রাম, জনরবকে পাত্তা দিয়ে সীতাকে বনবাসে পাঠিয়ে দিলে বাল্মীকি মুনির আশ্রমে পৌঁছার পর সীতা যখন বুঝতে পারে যে তাকে বনবাস দেওয়া হয়েছে, তখন সীতা লক্ষ্মণকে বলে, তোমার ভাই আমাকে মিথ্যা সন্দেহে ত্যাগ করলেও তুমি জেনে যাও যে আমি সবে মাত্র গর্ভ ধারণ করেছি। কিন্তু কৃত্তিবাসী রামায়ণে এই ছোটখাটো বিষয়গুলো উল্লেখ করা হয় নি, যাতে সূক্ষ্ম ঘটনাগুলো ধরা পরে; যেমন- উল্লেখ করা হয় নি, প্রথম বার বনবাসের পূর্বেই রাম সীতা প্রতিজ্ঞা করেছিলো যে, তারা বনবাসে গিয়ে ভোগ বিলাসে মত্ত হবে না, আর ভোগ বিলাসে মত্ত না হলে সন্তান হবে কিভাবে ? যে কথা উপরে একবার উল্লেখ করেছি। এই ভাবে কৃত্তিবাসী রামায়ণ যে কাউকে বিভ্রান্ত করতে সক্ষম, এই ভাবেই বিভ্রান্ত হয়েছিলো মাইকেল এবং সম্ভবত নিচের এই ঘটনাটা না জেনে-

কৃত্তিবাসী রামায়ণের প্রভাবে অনেকেই মনে করে লক্ষ্মণ, মেঘনাদকে বিনা যুদ্ধে অন্যায়ভাবে হত্যা করেছে। অর্থাৎ এটাকে তারা ছলনা বলেই মনে করে। কিন্তু তারও আগে মেঘনাদ যে ছলনা করে রাম-লক্ষ্মণকে হত্যা করার চেষ্টা করেছিলো, এটা অনেকেই জানে না বা বলা যায় কৃত্তিবাসী রামায়ণ তাদেরকে তা জানতে দেয় নি।

ঘটনাটি এরকম: মেঘনাদ বা ইন্দ্রজিৎ স্বয়ং যুদ্ধে নেমেও যখন কিছুতেই রাম লক্ষ্মণকে পরাস্ত করতে পারছিলো না, তখন সে একটি ছল করে; একদিন একটি মায়াসীতা তৈরি করে তার রথের উপর নিয়ে যুদ্ধ ক্ষেত্রে আসে এবং এবং রাম লক্ষ্মণকে বলে, এই সীতাকে উদ্ধারের জন্যই তো তোমরা লংকায় যুদ্ধ করতে এসেছো ? এখন দেখো, একে আমি কিভাবে হত্যা করি? বলেই সে নির্মম প্রহারে সীতাকে হত্যা করে, এটা দেখেই রাম লক্ষ্মণ মূর্ছিত হয়ে পড়ে যায়। তারপর কোনোরকমে হনুমান, সুগ্রীব তাদেরকে সেভ করে শিবিরে নিয়ে আসে। পরে শিবিরে এসে বিভীষণ যখন রাম লক্ষ্মণের মূর্ছিত হওয়ার কারণ জানতে পারে, তখন তাদেরকে বলে যে, মেঘনাদ যাকে হত্যা করেছে সেটা আসল সীতা নয়, একটা নকল সীতা; কারণ, রাবন কিছুতেই মেঘনাদকে এই কাজ করতে দিতে পারে না।

ইন্দ্রজিতের এই ছলের বিপরীতেই বিভীষণ এবং লক্ষ্মণ আরেক ছলের পরিকল্পনা করে এবং তাতেই ইন্দ্রজিৎ মারা যায়। তো এখানে দোষ কী ? ছলের ফল তো ছল ই হয়।

কিন্তু কৃত্তিবাসী রামায়ণের এই সব ভুল ভাল তথ্যের বিরুদ্ধে সেই সময় কথা বলার কোনো লোক ছিলো না, কারণ সংস্কৃত জ্ঞানের অভাবে কেউ আসল সত্য সম্পর্কে অবগত ছিলো না। একই ঘটনা ঘটেছে মাইকেলের মেঘনাদবধ কাব্য প্রকাশের পরেও, সঠিক জ্ঞানের অভাবে কেউ এর প্রতিবাদ করতে পারে নি।

কৃত্তিবাসী রামায়ণের প্রভাবে, আরজ আলী এটা মনে করতো যে, রামের চেয়ে রাবনের প্রতিভা বেশি, কেননা রাবন সেই সময় তার চলাচলের জন্য পুষ্পক রথ বানিয়েছিলেন, যাতে করে সে সীতাকে অপহরণ ক’রে সমুদ্র পারি দিয়ে তাকে লংকায় নিয়ে গিয়েছিললো; কিন্তু আরজ আলীর মতে, রামের এমন কোন বিমান ছিলো না, তাই তাকে সকলের সহায়তায় সমুদ্রের উপর সেতু নির্মান করে লংকায় যেতে হয়। কিন্তু কৃত্তিবাসী রামায়ণ এই তথ্য দেয় নি যে, রাবন যে পুষ্পক রথ ব্যবহার করতো, সেটা তার নিজের বানানো ছিলো না, ব্রহ্মা এই রথটি দিয়েছিলো কুবেরকে, কুবেরের কাছ থেকে রাবন তা ছিনতাই করে, যদিও কুবের ছিলো রাবনের সৎ ভাই।

এই ভাবে কৃত্তিবাস, রামায়ণের বহু সত্যকে চেপে গিয়ে বা কোথাও বিকৃত করে এক রামায়ণের মাধ্যমে হিন্দু সমাজের ১২টা বাজিয়ে দিয়ে গেছে।

রামায়ণের পুষ্পক রথ অর্থাৎ বিমান থেকে কিন্তু একটা বিষয় পরিষ্কার যে, হিন্দুরাই প্রথম বিমান আবিষ্কার করেছিলো বা হিন্দু ধর্মের তত্ত্ব বা প্রযুক্তিরই বাস্তব রূপায়ন আজকের বিমান যোগাযোগ ব্যবস্থা।

যা হোক, কৃত্তিবাস- রামায়ণ নিয়ে যে ছেলে খেলা খেলেছে, এটার পেছনে মধ্যযুগের মুসলিম শাসকদের ছিলো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সমর্থন। কারণ, মধ্যযুগের মুসলিম শাসকরা চায় নি যে, হিন্দুধর্ম, হিন্দুদের কাছে সঠিকভাবে উপস্থাপিত হোক। তাই মধ্যযুগে শুধু অনুবাদ করা কাব্যেরই বিকৃতি নয়, নতুন নতুন পুরাণ এবং উপনিষদও লেখা হয়েছে এবং করা হয়েছিলো বেদেরও বিকৃতি। এসবই ছিলো হিন্দুধর্মকে হিন্দুদের কাছে বিকৃতভাবে উপস্থাপন ক’রে, প্রকৃত হিন্দুত্বের রূপ হিন্দুদেরকে বুঝতে না দিয়ে, হিন্দুধর্ম ও কালচারকে ধ্বংস করার মধ্যযুগীয় ষড়যন্ত্র। কিন্তু অবাক করার ব্যাপার হলো, সেই ষড়যন্ত্র এখনও চলমান এবং তা হিন্দুদের মাধ্যমেই।

প্রাচীন ভারতীয় উপমহাদেশে ছিলো এবং এখনও আছে- বহু জাতি এবং তাদের বহু ভাষা, কিন্তু তাদের ধর্ম ও সংস্কৃতি ছিলো এক এবং তা ছিলো সনাতন এবং সনাতন ধর্মের মূল গ্রন্থগুলো লিখিত ছিলো এবং আছে সংস্কৃত ভাষায়। পরবর্তীতে বিভিন্ন জন, তাদের নিজ নিজ মাতৃভাষায় সনাতন ধর্মের এই গ্রন্থগুলোকে অনুবাদ করে; এভাবে অনুবাদ করার সময় সবার হাতেই প্রত্যেকটা গ্রন্থ কিছু না কিছু বিকৃত হয়েছেই, তাই ধর্ম এক হলেও ভারতের বিভিন্ন এলাকার কালচারে কিছু না কিছু ভিন্নতা আছেই; যেমন- কৃত্তিবাস, তার বাংলা রামায়ণে দুর্গা পূজার কথা উল্লেখ করেছিলো বলেই বাংলায় দুর্গা পূজা প্রচলিত হয়েছে, কিন্তু ভারতের আর অন্য কোনো জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে রামায়ণ প্রচলিত থাকলেও দুর্গা পূজা প্রচলিত নেই, কারন আর কিছুই নয়, সেই সব এলাকায় যে বা যারা রামায়ণ অনুবাদ করেছে, তারা তার মধ্যে দুর্গা পূজার উল্লেখ করে নি বা হয়তো অন্য কোনো পূজার উল্লেখ করেছে, যার মাধ্যমে ঐ এলাকায় সেই ধরণের উৎসব চালু হয়ে গেছে। একারণেই সম্ভবত ভারতের একেক এলাকায়, একেক ধরণের ধর্মীয় অনুষ্ঠানের প্রাধান্য।

মধ্যযুগে যারা সংস্কৃত থেকে বিভিন্ন ধর্মীয় গ্রন্থ অনুবাদ করেছে তারা যে তাদের ইচ্ছামতো যা খুশি তা অনুবাদ করেছে, সেটা তো কৃত্তিবাসের কীর্তি দেখে কিছুটা অনুমান করতে পেরেছেন। কিন্তু এই সময়ে এসেও কেউ যদি প্রকৃত সত্যকে চাপা দেওয়ার চেষ্টা করে, তাদের উদ্দেশ্যকে আপনি কীবলবেন ? নিশ্চয়, হিন্দু ধর্মকে ধ্বংস করার নতুন ষড়যন্ত্র ? হ্যাঁ, এই কাজটিই করা শুরু করেছে ভারতের উত্তর প্রদেশের গোরক্ষপুরের গীতা প্রেস

গীতা প্রেস শুধু গীতা ই ছাপায় না, এরা প্রায় সব হিন্দু ধর্মীয় গ্রন্থ, ভারতের প্রায় সব প্রধান ভাষায় ছাপিয়ে বিজনেস করে। এভাবে এরা বাংলা রামায়ণও সংস্কৃত থেকে অনুবাদ করে ছাপিয়ে বিক্রি করছে, কিন্তু সর্বনাশটা যেখানে করছে, তা হলো, তাদের ছাপানো গ্রন্থের মধ্যে দিয়ে তারা তাদের নিজস্ব বিশ্বাসকে মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দেবার অপচেষ্টা করছে।

আমি যদি মাছ মাংস অর্থাৎ আমিষ খাই, সেটা যেমন আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার; তেমনি আমি যদি নিরামিষ খাই, সেটাও আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার। কিন্তু আমি যখন শাস্ত্রের কথা বলবো, তখন শাস্ত্রে যেটা লিখা আছে, সেটাই আমাকে বলতে হবে; সেখানে আমি যদি আমার মতামত বা ইচ্ছাকে কৌশলে শাস্ত্রের মধ্যে দিয় প্রকাশ বা প্রমান করার চেষ্টা করি, সেটাকে আপনার কী বলবেন ? নিশ্চয় অপরাধ ? সেই অপরাধই করে চলেছে গোরক্ষপুরের গীতা প্রেস।

বাল্মীকি রামায়ণে বেশ কয়েক জায়গায় স্পষ্ট করে লিখা আছে যে, বনবাস কালে রাম সীতা লক্ষ্মণ বিভিন্ন প্রাণী হত্যা করে তার মাংস খেতো। কিন্তু গোরক্ষপুরের গীতা প্রেস যেহেতু চালায় একটি নিরামিষ ভোজী গোষ্ঠী অর্থাৎ তৃণভোজীরা, সেহেতু তারা ঐ সব শ্লোকের বাংলা অনুবাদ করার সময় টীকা হিসেবে লিখে দিয়েছে যে, এসব জায়গায় অমুক অমুক গাছের মূল বা ফল বুঝতে হবে। এর কারণ, তারা যেহেতু হিন্দু ধর্মের প্রকৃত সত্য না জেনে বিভ্রান্ত হয়ে নিরামিষ ভোজী, তারাও চায় সবাই তাদের মতো নিরামিষ ভোজী হোক; তাই তাদের মতে, রাম সীতার পক্ষে মাংস খাওয়া- ইন ওয়ান ওয়ার্ড- অসম্ভব।

আগের কয়েকটি পোস্টেও আমি এই কথা বলেছি যে, বনবাস কালে রাম সীতা বিভিন্ন প্রাণীর মাংস ভোজন করতেন; এটাও তথ্য প্রমান এবং উদাহরণ দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছিলাম যে, সীতা যে হরিণ শিকারের জন্য রামকে পাঠায়, যে সময় সে রাবন কর্তৃক অপহৃত হয়েছিলো, সেটা তারা খাওয়ার জন্যই শিকার করতে চেয়েছিলো; কারণ, হরিণ ধরে পোষার শখ করার মতো অবস্থা সেই সময় সীতার ছিলো না। কিন্তু সীতার হরিণ ধরতে চাওয়ার কারণ তো পাবলিককে নিরামিষ আকারে বোঝাতে হবে যে কেনো সীতা, রামকে হরিণ ধরতে পাঠিয়েছিলো ? তাই কৌশলে সেই মায়া হরিণকে সোনার হরিণ বানিয়ে দিয়েছে। কিন্তু সোনার হরিণ বলে যে বাস্তবে কিছু হয় না, সেটা আমাদের বাঙ্গালি হিন্দুদের মাথায় গত ৫/৬ শ বছরেও ধরা পড়ে নি, আমি বলার আগে।

এই পোস্টে এই পর্যন্তই, এই আলোচনার বাকি অংশ পাবেন এই সিরিজের ২য় পর্বে

জয় হিন্দ।
জয় শ্রীরাম, জয় শ্রীকৃষ্ণ।